চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর— নামটি এখন শুধু একটি পাহাড়ি জনপদের নয়, বরং আতঙ্ক, সন্ত্রাস আর ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্রের’ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাজারো সদস্যের অভিযান, অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন, দফায় দফায় অভিযান— সবকিছুর পরও প্রশ্ন উঠেছে, আসলে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? সরকারের, নাকি ইয়াছিন বাহিনীর?
গত রোববার গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্পে ত্রিমুখী হামলার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। এক্সক্যাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয় পুরো এলাকা। ট্রাকে করে আনা হয় হামলার সরঞ্জাম, মোটরসাইকেলে আসে সশস্ত্র লোকজন। এরপর কয়েক ঘণ্টাজুড়ে চলে গুলিবর্ষণ, ভাঙচুর ও আতঙ্ক।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণ শ্রমিকদের ভাষ্য, হামলাকারীরা এতটাই সংগঠিত ছিল যে তারা যেন পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েই অভিযান চালিয়েছে। নির্মাণ শ্রমিক মো. নীরব বলেন, ‘আমাদের যদি দেখত, তাহলে নিশ্চিত মেরে ফেলত। মনে হচ্ছে নিজের চোখে আজরাইল দেখছি। মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছি।’
আরেক শ্রমিক শাহীন আলম বলেন, ‘সবার হাতে অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র ছিল। তারা গুলি করতে করতে ক্যাম্পে হামলা চালায়। আমাদের মারধরও করেছে, টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে গেছে।’


স্থানীয় সূত্র বলছে, জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ইয়াছিন গ্রুপ। পাহাড়ি এই এলাকায় কারা প্রবেশ করবে, কে বসতি গড়বে, কোথায় রাস্তা হবে— সবকিছুই অনেকটা তাদের সিদ্ধান্তে নির্ভরশীল।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, গত ৯ মার্চ তিন হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়। সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন ওই অভিযানে। অভিযানের পর সেখানে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে যৌথ বাহিনী। দাবি করা হয়, এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু দেড় মাস না যেতেই নির্মাণাধীন ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— নিয়ন্ত্রণ কি আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখানে তাদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আসায় তাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছে। তাই তারা যেকোনোভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে।”
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ইয়াছিন গ্রুপ প্রায় ১৮-২০ বছর ধরে এই এলাকায় একটা নিজস্ব রাষ্ট্র তৈরি করেছে। সেখানে আমরা অভিযান পরিচালনা করে তাকে উৎখাত করেছি। তারা স্বার্থের জন্য, সরকারকে বিব্রত করার জন্য সবকিছুই করছে। সে (ইয়াছিন) যেহেতু ক্রিমিনাল, তার সব খারাপ ইস্যু নিয়েই সে এই হামলা করেছে।’


স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পরও মূল সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। বরং ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’ এখনো তাদের হাতেই আছে। পাহাড়ের দুর্গম পথ, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যবহার করে তারা সহজেই আত্মগোপন করছে।
জানা গেছে, ২০০২-০৩ সালের দিকে ছিন্নমূল মানুষের বসতি গড়ে ওঠার পর ধীরে ধীরে জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তার শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠে অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণের সাম্রাজ্য। একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াছিন এখন পুরো এলাকার ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে পরিচিত।
র্যাবের দাবি, রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাহিনী পৌঁছানোর আগেই পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে পালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন একটাই— যদি সত্যিই সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে শতাধিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের উপস্থিতিতে কীভাবে গভীর রাতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ক্যাম্প ভেঙে ফেলা হয়?
জঙ্গল সলিমপুর এখন যেন শুধু একটি পাহাড়ি এলাকা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আর সন্ত্রাসী আধিপত্যের এক অঘোষিত লড়াইয়ের নাম।














