মিরসরাইয়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিনের ব্যবধানে যমজ দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২ জুন) নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আবদুল্লাহ আল ফাহিমের।
বুধবার (৩ জুন) রাত ১১টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গত ২২ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেক ভাই আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যু হয়। তাদের বয়স ছিল এক বছর।
মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা হারুনুর রশিদ ও ইসরাত জাহান দম্পতির ঘর আলো করে গত বছরের ১৬ এপ্রিল আবদুল্লাহ আল ফাহিম ও আবদুল্লাহ আল নোমানের জন্ম হয়েছিল। মারা যাওয়া এই দুই সন্তান ছাড়াও ছয় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে তাদের।
হারুনুর রশিদ বলেন, ‘স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এনজিও—কারও কাছে হাত পাততে বাকি রাখিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। ছেলেদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছি, তবুও বুকের দুই ধনকে বাঁচাতে পারলাম না। হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিনের ব্যবধানে আমার এক বছর বয়সী যমজ দুই ছেলের মৃত্যু হয়েছে। সন্তানদের চিকিৎসার প্রায় সব টাকাই ঋণ করে খরচ করেছি। এখন এ ঋণের বোঝা আর শোক একসঙ্গে বয়ে বেড়াচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই আমার দুই ছেলে ছিল বেশ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। চলতি বছরের ৮ মার্চ ফাহিমের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
১৮ মার্চ তার শরীরে হাম শনাক্ত হয়। সেবার ফাহিম কিছুটা সুস্থ হলে ২৫ মার্চ তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যে আবার তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। পরে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এর মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নোমানেরও হামের উপসর্গ দেখা দেয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর তার শরীরেও হাম শনাক্ত হয়। এরপর ২২ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নোমানের মৃত্যু হয়।’
এদিকে হামের পর সৃষ্ট নানা জটিলতায় ফাহিমের অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। নোমান মারা যাওয়ার পরদিন ফাহিমকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) সংকট থাকায় তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় ফাহিমকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হারুনুর রশিদ বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। চার বোনের পর আমি পরিবারের একমাত্র ছেলে। বাজারে ছোট একটি মুদিদোকান করে কোনোমতে সংসার চালাই। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য গত তিন মাস দোকান খুলতে পারিনি। প্রায় ছয় লাখ টাকার ধারদেনা করেছি। হাসপাতালে না খেয়ে থেকেছি অনেক সময়। টাকা খরচ হলেও যদি ছেলেদের ফিরে পেতাম, কোনো আফসোস থাকত না। এখন আমাকে দেনার মধ্যে ফেলে দুই বুকের ধন চলে গেছে।’
হারুনুর রশিদের প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বাচ্চা দু’টি খুবই সুন্দর আর হাসিখুশি ছিল। এলাকার সবাই তাদের খুব আদর করত। একই পরিবারের দুই শিশুর এমন মৃত্যু আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’
মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার নাছির উদ্দিন বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে মিরসরাইয়ের দুই শিশুর মৃত্যুর এমন তথ্য আমাদের কাছে জানা নেই। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হলে এ ধরনের রোগীর তথ্য আমাদের কাছে থাকে।’














