২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর

সাংবাদিকদের পাসকার্ড না দেয়ায় তীব্র ক্ষোভ, সমালোচনা-নিন্দা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবার কক্সবাজার সফর করেছেন শনিবার (১৩ জুন)। তার আগমন ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীসহ জেলাবাসীর উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে এবং সফরকালীন সকল ইস্যু বা ঘটনা সংবাদ আকারে প্রচার করে দেশ ও বিশ্বময় জানান দেয়ার দায়িত্বপালন করেছেন সাংবাদিকরা।

কিন্তু সফর ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বা পিএম বহরে যাবার কোন ধরণের পাসকার্ড দেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে, সংবাদ কাভার করতে গিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন ভিডিও এবং চিত্র গ্রহণে দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকরা। দিনব্যাপী একাধিক কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে জেলার অধিকাংশ গণমাধ্যমকর্মী অনুমতিপত্র না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন বলে সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেছেন।

তবুও থেমে থাকেনি সংবাদ প্রচার। দায়িত্বশীল সংবাদকর্মীরা সম্পন্ন হওয়া কর্মসূচীর খবর যেকোন ভাবে নিজ নিজ হাউজে পাঠিয়ে প্রচার ও প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। তবে, কয়েক দশকের মাঝে এ প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর প্রোগ্রামে সংবাদ কাভারের পাসকার্ড না পাওয়ার ঘটনায় জেলার সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আওতায় জনসমাবেশ ছাড়াও পিএমখালীর পাতলী খাল পুনঃখনন উদ্বোধন, সুধী সমাবেশ, উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য কোনো পাসকার্ড ইস্যু করা হয়নি। ফলে তারা নির্ধারিত ভেন্যুতে প্রবেশ, তথ্য সংগ্রহ, ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধার মুখে পড়েন। অনেককে পিএমও’র সামাজিক সাইডে প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করতে হয়েছে।

কক্সবাজার রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রাসেল চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে পিএম বিটের সাংবাদিকরা থাকলেও স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতি সবসময় গুরুত্ব সহকারে নেয়া হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে প্রতিনিধি পাঠালেও অনেক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় প্রতিনিধির ওপর নির্ভর করে। অতীত সময়ে পাসকার্ড দেয়ায় সবাই নিয়ম মেনে সংবাদ সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

তিনি আরো বলেন, শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সারা দিনব্যাপী সংবাদ সংগ্রহে ভোগান্তি দেওয়ার অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এটি সাংবাদিকতার মর্যাদার পরিপন্থী। কক্সবাজার রিপোর্টার্স ইউনিটি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (ক্র্যাক)-এর সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, জেলা পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সফরে স্থানীয় সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনার ঘটনা এটাই প্রথম দেখলাম। শুধু তাই নয়, সুধী সমাবেশেও কোনো সাংবাদিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি প্রেসক্লাবের শীর্ষ নেতৃত্বসহ সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন,এটি শুধু কক্সবাজারের সাংবাদিকদের জন্য নয়, বরং সারা দেশের সাংবাদিক সমাজের জন্যই একটি কলঙ্ক ও দুঃখজনক ঘটনা। স্থানীয় সাংবাদিকদের এভাবে বঞ্চিত করা সংবাদপেশার মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি বলেন, আমার ৪০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এমন ঘটনা দেখিনি। কোনো জেলার স্থানীয় সাংবাদিকদের এভাবে রাষ্ট্রীয় সফরের সংবাদ সংগ্রহ থেকে বঞ্চিত করার নজির নেই। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন কোনো জেলায় আসেন না। তাই স্থানীয় সাংবাদিকরা এমন সফর কাভার করার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন। কিন্তু একটি চক্র সেই সুযোগ নষ্ট করেছে।

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি সভায় এসএসএফ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, স্থানীয় সাংবাদিকদের অনুমোদনের বিষয়টি জেলা ও পুলিশ প্রশাসন দেখবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।

সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজারে আসার আগের দিন রাত ১১টা পর্যন্ত ডিএসবি অফিস থেকে জানানো হয়েছিল পাসকার্ড দেয়া হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা হয়নি। ফলে বিকল্প কোনো সুযোগও ছিল না। সাংবাদিকদের এভাবে বঞ্চিত করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এ ঘটনার বিরুদ্ধে আমরা সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ জানাব।

সাংবাদিকদের সারাদিন অভিযোগ, বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রবেশের অনুমতি না থাকায় অনেকেই দূর থেকে অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করতে বাধ্য হন। এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ছবি ও তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের বঞ্চনার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জেলার প্রায় সব সাংবাদিক নিজ নিজ ফেসবুক আইডিতে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট করেছেন। অনেকেই এটিকে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজের প্রতি অবমূল্যায়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বলে মন্তব্য করেছেন।

সাংবাদিকদের দাবি, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সফরে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রচলিত ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এবার তা উপেক্ষিত হয়েছে, যা পেশাগত মর্যাদার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

দায় নিচ্ছে না কেউ
জেলা প্রশাসন বলছে, তারা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তালিকা যথাযথভাবে পাঠিয়েছেন। তবে কেন সাংবাদিকদের পাসকার্ড ইস্যু করা হয়নি, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মোহাম্মদ শামীম কবীর বলেন, সাংবাদিকদের জন্য পাসকার্ড ইস্যু না করার বিষয়ে উপর থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তিনি জানান, জেলা প্রশাসন থেকে পাঠানো সাংবাদিকদের তালিকা ধরে আগেই যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল। এ সময় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রেস আইডি ও ছবি সংগ্রহ করে ভেরিফিকেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে আগেভাগেই সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রস্তুত ছিলাম। তবে চূড়ান্ত কোনো নির্দেশনা না আসায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের জন্য কোনো পাসকার্ড ইস্যু করা সম্ভব হয়নি।

এবিষয়ে কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সংবাদ কাভারেজ সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি হয়েছে। এ কারণে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং ক্ষমাপ্রার্থী। সাংবাদিকদের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুলত্রুটির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। পাসকার্ড না পেয়েও স্থানীয় সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে পিছপা হননি, বয়কট করেননি-আমি সত্যি বিমোহিত। সফর সফল করতে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবার প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আরও পড়ুন