জীবনে মানুষ সাধারণত ভাবে, কষ্টের সবচেয়ে বড় নাম দারিদ্র্য। আমিও একসময় তাই ভাবতাম। মনে হতো টাকা থাকলে হয়তো সবকিছু বদলে যেত, প্রিয় মানুষদের কষ্ট কমে যেত, হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে লড়াইটা একটু সহজ হতো। কিন্তু জীবন আমাকে দুই ধরনের অসহায়তার সামনে দাঁড় করিয়েছে— একটা অভাবের, আরেকটা প্রাচুর্যের মাঝেও হেরে যাওয়ার।
আমার আব্বা ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন সাধারণ কর্মচারী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সততার সাথে চাকরি করেছেন। সততা মানুষকে সম্মান দেয়, কিন্তু সবসময় সচ্ছলতা দেয় না। নিজের সীমিত বেতনে সংসার চালিয়েছেন, আমাদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন সব ছেলেকে গ্রেজুয়েট, মাস্টার্স করিয়েছেন। দীর্ঘ বিশ বছর ধরে ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। অথচ শেষ সময়ে আমরা তাঁর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকুও নিশ্চিত করতে পারিনি। ওষুধ ঠিকমতো কেনা হয়নি, স্যালাইন ছিল না, অক্সিজেন ছিল না। একদিন একদিন করে তিনি নিভে গেছেন গ্রামের পিতার বাড়িতে , যেন একটি প্রদীপ ধীরে ধীরে শেষ আলোটুকু হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়—আমরা জানতেও পারিনি তিনি ঠিক কোন রোগে চলে গেলেন। কারণ পরীক্ষা করার সামর্থ্যও ছিল না আমাদের।
তখন আমরা ছিলাম স্কুল কলেজ ভার্সিটির ছাত্র। সামনে শুধু অন্ধকার, অনিশ্চয়তা, আর মায়ের চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা নীরব কান্না। মা আমাদের বুকে আগলে রাখলেন। আমরা হাল ছাড়িনি। নিজেরা চেষ্টা করেছি, আত্মীয়দের সহযোগিতা পেয়েছি। সময় বদলেছে। তিন ভাই পড়াশোনা শেষ করেছি, ব্যবসা হয়েছে, চাকরি হয়েছে, বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, টাকার অভাব আর থাকেনি।
কিন্তু জীবন বোধহয় সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয় তখন, যখন মানুষ ভাবে— ‘এখন আমি পারবো।’
মা অসুস্থ হলেন। এবার আর কোনো অভাব ছিল না। নামী ডাক্তার দেখিয়েছি, হাসপাতালের চিকিৎসা দিয়েছি, আয়া-নার্স রেখেছি, বাসায় হাসপাতালের মতো পরিবেশ তৈরি করেছি। ডাক্তার বলেছিলেন, চিকিৎসা ব্যয়বহুল, সময় লাগবে। আমরা বলেছিলাম— পারবো। কারণ এবার আমাদের কাছে টাকা ছিল। বিল দেয়ার মতো টাকা।
কিন্তু জীবনের কিছু দরজা আছে, যেগুলো টাকার চাবি দিয়ে খোলা যায় না।
ছোট ভাই মনসুর বলেছিল, “আম্মা একটু মাথা তুলতে পারলে আমি ঢাকায় নিয়ে যাবো।” কিন্তু মা আর মাথা তুললেন না। মিনার বলছিলো আমার কাছে থাকলেও অসুবিধা নেই। ওর বাসায় মেডিক্যাল বিছানা খাট এয়ার বেড, অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্রেসার মেশিন, ডায়বেটিস মাপার যন্ত্র, অক্সিমিটার,সহ মায়ের জন্য দামি দামি মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট কিনেছি আলাদা একটা ফ্লাট নিয়েছিলাম আমরা ৪ ভাইবোন থাকার জন্য সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম মাসে ১০ দিন করে আমরা মায়ের সাথে থাকবো।
মায়ের ছোট ছোট স্বপ্ন ছিল— হজ্জ করবেন, গ্রামের বাড়িতে পাকা ঘরে থাকবেন, ছেলেদের গাড়িতে চড়বেন, প্লেনে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করবেন। আল্লাহর রহমতে আমরা সাধ্যমতো সব পূরণ করেছি। কিন্তু শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করতে পারিনি— মাকে ধরে রাখতে পারিনি।
আমি নিজের চোখে দুই ধরনের কষ্ট দেখেছি। একবার টাকা ছিল না, তাই মানুষটাকে বাঁচাতে পারিনি। আরেকবার টাকা ছিল, তবুও মানুষটা বাঁচালোনা।
সেদিন বুঝেছি, দারিদ্র্য মানুষকে অসহায় করে, কিন্তু অর্থও মানুষকে সবসময় শক্তিশালী করে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় মুহূর্ত সম্ভবত সেটাই—যখন সব সামর্থ্য হাতে নিয়েও, প্রিয় মানুষটার হাতটা আর ধরে রাখা যায় না। সবকিছু তুচ্ছ করে মা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।কাউকে বিরক্ত আর কষ্ট না দিয়ে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।














