জীবনের ৮৫টি বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন রানী বালা মিত্র। কিন্তু বয়সের শেষ প্রান্তে এসে তার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম এখন বেঁচে থাকার। মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ, নেই স্বজনের আশ্রয়। জীর্ণ-শীর্ণ একটি ঝুপড়ি ঘরে প্রতিটি দিন কাটে অনিশ্চয়তায়, আর বর্ষার প্রতিটি রাত নামে আতঙ্ক হয়ে। চারদিক দিয়ে পানি পড়া সেই ভাঙা ঘরটিই এখন মধু বুড়ির পৃথিবী— যেখানে অভাব, অসহায়ত্ব আর দীর্ঘশ্বাসই একমাত্র সঙ্গী।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বোয়ালগাঁও দক্ষিণ পাড়া গ্রামে বসবাস করেন রানী বালা মিত্র। তবে এলাকায় তিনি ‘মধু বুড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। এরপর একমাত্র ছেলের মৃত্যুর শোকও সইতে হয়েছে তাকে। বর্তমানে বয়সে ভারাক্রান্ত এক কন্যাকে নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন এই বৃদ্ধা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনের তৈরি ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘর। চারপাশের বেড়া ভাঙাচোরা, চালের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ছিদ্র। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে ছাউনি। ঘরের ভেতরে আসবাব বলতে তেমন কিছুই নেই। ছেঁড়া কাপড়, পুরোনো কাঁথা আর শাড়ি জড়িয়ে তৈরি করা একটি বিছানাই তাদের রাত কাটানোর একমাত্র ব্যবস্থা।
ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন মধু বুড়ি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, হালকা কাপড়ে ঢাকা কাঁপতে থাকা দেহ। অন্যের সহায়তা ছাড়া হাঁটতে পারেন না। ঠিকমতো শুনতে কিংবা বলতেও পারেন না। তবুও তার চোখে যেন লুকিয়ে আছে অসহায় জীবনের হাজারো না বলা গল্প।
স্থানীয়রা জানান, শীতকালে কুয়াশা আর শিশির, বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি— সবকিছুই ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরে। ভারী বৃষ্টি হলে পুরো মেঝে পানিতে ভিজে যায়। এমনকি জীর্ণ চালটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, তাদের কোনো টয়লেটও নেই।
বয়সের ভার আর নিঃসঙ্গতার মাঝেও মধু বুড়ির সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা একটি নিরাপদ আশ্রয়। জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত একটি শুকনো ও নিরাপদ ঘরে কাটাতে চান তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্নও যেন আজ অনেক দূরের।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বলেন, ‘মধু বুড়ি অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজে অনেক বিত্তবান মানুষ আছেন। কেউ যদি তার ঘরটি একটু মেরামত করে দিতেন, তাহলে বৃদ্ধার অনেক কষ্ট লাঘব হতো। আমি সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।’
একটি নিরাপদ ঘর, একটি শুকনো বিছানা কিংবা একটু মানবিক সহায়তা— এগুলোই এখন মধু বুড়ির সবচেয়ে বড় চাওয়া। সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগ হয়তো বদলে দিতে পারে এই অসহায় বৃদ্ধার জীবনের শেষ অধ্যায়। কারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নামই তো মানবতা।














