২৩ অক্টোবর ২০২৬

লিওনেল মেসি : পরশ পাথরের আরেক স্পর্শ

টেক্সাসের ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলের জয়টি কেবল ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচ ছিল না, এর মহিমা ছিল বিশ্বের তাবৎ দর্শককে লাইভ টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে লিওনেল মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি অধ্যায় প্রদর্শন। ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন পরিসংখ্যান আর ফলাফল পেছনে সরে যায়, আর সামনে এসে দাঁড়ায় একজন ফুটবলারের সম্মোহনের ক্ষমতা। ডালাসের স্টেডিয়াম ছিল এক পর্যটন দুপুর, যেখানে কেবলই রৌদ্রের পোতাশ্রয়ে লিওনেল মেসির জন্য ছিল আনন্দাশ্রু প্রার্থনা।

ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। কোনো খেলোয়াড়ের জন্য এটি হতে পারত— অন্তঃশীল মাথার ভেতর তেপান্তরের মাঠে তার আত্মবিশ্বাস হারানোর কারণ। কিন্তু লিওনেল মেসির ফুটবলজীবনে অন্তরালের প্রধান বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর প্রতিভা নয়, বরং ব্যর্থতার সঙ্গে তাঁর আবাস। মেসির সুষুপ্তির গভীরে আছে যে স্বপ্নের মোহময় নদী, সেখানে ব্যর্থতায় তিনি ডুবে যান না, সেখানে নিজের সৃষ্টির উপাদানে ভেসে ওঠেন বারবার। তাই পেনাল্টি মিসের ক্ষণিক অন্ধকারও তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং সেই ব্যর্থতা থেকেই ভাসিয়েছেন মেসির পরবর্তী উজ্জ্বলতা।

প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে যে গোলটি তিনি করলেন, তা ছিল নিছক একটি ফিনিশ নয়, ছিল বাম পায়ের অনুভুতিময় সৌন্দর্যের এক নিখুঁত উপসংহার। ফাকুন্দো মেদিনার ক্রস, থিয়াগো আলমাদার বুদ্ধিদীপ্ত ছেড়ে দেওয়া বল, আর তারপর মেসির বাঁ পায়ের অনিবার্য স্পর্শ— যেন সেই মুহূর্তটি আগে থেকেই লেখা ছিল কোনো অদৃশ্য সম্মোহনের পাণ্ডুলিপিতে। বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল দীর্ঘদিনের এক বিশ্বরেকর্ড, কেঁপে উঠলো পূর্ব রেকর্ডের অশান্ত সংখ্যা। কিন্তু গোলটির তাৎপর্য সংখ্যার চেয়ে অনেক বড় ছিল, মাঠের গোলটি ছিল তাঁর বয়স্ক সময়কে অস্বীকার করার এক ঘোষণা।

ফুটবলে বয়স সাধারণত শরীরের ক্ষয়কে নির্দেশ করে। কিন্তু মেসির সমগ্রতায় বয়স যেন ক্রমশ অভিজ্ঞতার এক নান্দনিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সময় গড়িয়ে ৩৯ বছর বয়সে তিনি আর আগের মতো প্রতি মুহূর্তে দৌড়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙে ফেলেন না। বরং খেলার ছন্দ, গতি ও স্থানকে নিয়ন্ত্রণ করেন এমনভাবে, যেন তিনি নিজেই খেলার কক্ষপথের কেন্দ্র। তাঁর পাসিং, বল গ্রহণ, অবস্থান নির্বাচন এবং খেলার পাঠ— সবকিছু মিলিয়ে মেসি যেন মাঠের ভেতরে গোপনে আরেকটি অদৃশ্য মানচিত্র আঁকেন, এমন গোপন সৌন্দর্য যা অন্যদের মার্কিংয়ে ধরা পড়ে না।

অতিরিক্ত সময়ে দ্বিতীয় গোলটি ছিল সেই শিল্পকর্মের শেষ তুলির আঁচড়। ম্যাচ তখন কার্যত শেষ, কিন্তু মেসির সৃজনশীল ক্ষুধা শেষ হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় গোল শুধু আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেনি, ফুটবল ইতিহাসে তাঁকে আরও একাকী নক্ষত্রনাবিকের উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে তাঁর আরোহণ কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত এক নক্ষত্রনাবিকের একাকী যাত্রার স্বীকৃতি।

অস্ট্রিয়া-আর্জেন্টিনা ম্যাচে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল তাঁর উপস্থিতির গভীরতা। তিনি শুধু গোল করেননি, তিনি পুরো ম্যাচের বোধ ও ভাষা সময়ের বৃত্ত দিয়ে নির্ধারণ করেছেন। অস্ট্রিয়ার শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, তাদের হাই প্রেসিং, তাদের শারীরিক শক্তি— সবকিছুর বিপরীতে মেসি ছিলেন প্রশান্ত। যেন চারপাশের তাড়াহুড়োর পৃথিবীতে তিনি একমাত্র মানুষ, যার কাছে সময় এখনও ধীরে প্রবাহিত হয়।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক মহান খেলোয়াড় এসেছেন, অনেকেই অসাধারণ পরিসংখ্যানও রেখে গেছেন। কিন্তু লিওনেল মেসির সৌন্দর্যরাশির বিশেষত্ব অন্যত্র। তিনি সংখ্যাকে আবেগে, রেকর্ডকে স্মৃতিতে এবং খেলাকে মর্যাদাবান শিল্পে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। ডালাসের এই আলোময় দুপুর তাই কেবল দুটি গোলের গল্প নয়, মেসি নামক এক শিল্পীর দীর্ঘ সৃষ্টিযাত্রার আরেকটি অনুভবময় পরশ পাথর। তাঁর বাঁ পায়ের স্পর্শে সাধারণ মুহূর্ত অসাধারণ হয়ে উঠেছে, পরিসংখ্যান রূপ নিয়েছে কিংবদন্তিতে, আর ফুটবল খেলার রসধারা পৌঁছে গেছে শিল্পের মর্মরে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মেসির পরপর দুইটি ম্যাচই হয়ে উঠেছে ফুটবল বিশ্বের বিশ্বস্ত প্রণোদনা।
লেখক: কবি, সাহিত্যিক ও সমালোচক।

আরও পড়ুন