বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে সভাপতি পদে অভিনেতা শিবা শানু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অভিনেতা জয় চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছেন। শুক্রবার (৩ জুলাই) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষে রাতভর গণনা শেষে শনিবার (৪ জুলাই) ভোর পৌনে ৫টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কামাল মো. কিবরিয়া লিপু।
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে চলচ্চিত্রাঙ্গনে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ভোটের দিন সকাল থেকেই বিএফডিসি প্রাঙ্গণে প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় উৎসবের আবহ। দীর্ঘদিন পর এমন প্রাণবন্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শিল্পীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। নির্বাচনকে ঘিরে শিল্পীদের মধ্যে মতবিনিময়, সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী ও ভোটাররা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পী সমিতির মোট ৫৭৬ জন ভোটারের মধ্যে ৪৮০ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা মোট ভোটারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ভোট গণনা শেষে ৪৬৩টি ব্যালট বৈধ এবং ১৭টি ব্যালট বাতিল ঘোষণা করা হয়। ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে গণনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘোষিত ফলাফলে সভাপতি পদে অভিনেতা শিবা শানু ২৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফাইট ডিরেক্টর ও অভিনেতা আরমান পান ১৭৩ ভোট। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় চৌধুরী ২৩৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেত্রী রুমানা ইসলাম মুক্তি পান ১৭৯ ভোট। ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিএফডিসি প্রাঙ্গণে বিজয়ী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। ফুলেল শুভেচ্ছা, করতালি এবং অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে নবনির্বাচিত নেতাদের বরণ করে নেন সহকর্মীরা।


এবারের নির্বাচনকে ঘিরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় দুটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের মধ্যে। একটি ছিল ‘আরমান–মুক্তি পরিষদ’ এবং অন্যটি ‘শিবা শানু–জয় চৌধুরী পরিষদ’। উভয় প্যানেলই নির্বাচনের আগে শিল্পীদের কাছে নিজেদের পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালায়। বিএফডিসির বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণা, পোস্টার, ব্যানার, মতবিনিময় সভা এবং ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শিল্পীদের কল্যাণ, চিকিৎসা সহায়তা, পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি, সাংগঠনিক কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ এবং চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন—এসব বিষয় ছিল প্রার্থীদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম প্রধান অংশ।
ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রে শিল্পীদের দীর্ঘ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন। অনেকেই নির্বাচনকে শিল্পী সমাজের গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভোট শেষে বিভিন্ন প্রার্থী ও ভোটাররা সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানান।
ফলাফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত সভাপতি শিবা শানু শিল্পী সমাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শিল্পীদের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের প্রতিদান দিতে তিনি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেন। শিল্পী সমিতিকে আরও কার্যকর, গতিশীল ও কল্যাণমুখী সংগঠনে পরিণত করার পাশাপাশি শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্য সুদৃঢ় করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে, এখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলচ্চিত্র পরিবারের স্বার্থে কাজ করার সময়।
নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জয় চৌধুরীও ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, শিল্পীদের যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা তাকে নির্বাচিত করেছেন, তা পূরণে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। শিল্পীদের কল্যাণ তহবিল আরও শক্তিশালী করা, অসচ্ছল শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো, নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরিতে তিনি গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিও সম্মান জানিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পী সমিতি শুধু একটি পেশাজীবী সংগঠন নয়; এটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান। তাই নতুন নেতৃত্বের সামনে শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তা, কল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, চিকিৎসা সহায়তা বৃদ্ধি, অবসরপ্রাপ্ত ও অসচ্ছল শিল্পীদের সহযোগিতা, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং চলচ্চিত্র শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখার বড় দায়িত্ব রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের চলচ্চিত্র শিল্প বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা কমে যাওয়া, দেশীয় চলচ্চিত্রের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন শিল্পী তৈরির সুযোগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা চলচ্চিত্রের অবস্থান শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলোতেও শিল্পী সমিতির সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এসব বিষয়ে সরাসরি নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা সমিতির নেই, তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, প্রযোজক, পরিচালক এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে শিল্পীদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সংগঠনটি।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অভিনন্দন জানান চলচ্চিত্রাঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি, শুভানুধ্যায়ী এবং ভক্তরা। একই সঙ্গে অনেকে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, নতুন নেতৃত্ব অতীতের বিভাজন দূর করে শিল্পী সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ করবে এবং শিল্পীদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
শিল্পী সমিতির সাবেক নেতাদের অনেকেই মনে করেন, নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষের শিল্পীদের সমন্বয়ে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা গেলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে এবং শিল্পীদের স্বার্থও অধিকতর সুরক্ষিত হবে।
সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন চলচ্চিত্রাঙ্গনে নতুন নেতৃত্বের সূচনা করেছে। সভাপতি হিসেবে শিবা শানু এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জয় চৌধুরীর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তাদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। এখন সেই আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়ে শিল্পীদের কল্যাণ, সংগঠনের সুশাসন, পারস্পরিক ঐক্য এবং দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অগ্রযাত্রায় কার্যকর ভূমিকা রাখাই হবে নবনির্বাচিত নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা।














