বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে ফিরে আসে পাহাড়ধসের আতঙ্ক। এবারও কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম বিভাগসহ দেশের সাত জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি জেলাগুলো, যেখানে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কারণও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রামে একদিনে ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ভারী বৃষ্টির কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে দেখা দিয়েছে নতুন করে ধসের আশঙ্কা।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ জানান, এবার মৌসুমি নিম্নচাপ বাংলাদেশের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে পশ্চিমমুখী অগ্রসর হওয়ায় চট্টগ্রাম বিভাগে কয়েকদিন ধরে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। পূর্বদিকে পাহাড় থাকায় আর্দ্র বাতাস আটকে গিয়ে একই এলাকায় দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হয়েছে, যা পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বৃষ্টিপাতই নয়, পাহাড় কাটা, পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন এবং প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংসের কারণেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো তুলনামূলক নবীন ও বালুময় হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয়প্রবণ। কিন্তু নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও বসতি নির্মাণ সেই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই দশকে চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন এবং ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১৬০ জনের বেশি প্রাণ হারান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলেও পরবর্তী পাহাড়ধস কত বড় হবে তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পাহাড়ের মাটি এখনো পানিতে সম্পৃক্ত থাকায় নতুন করে অল্প সময়ের মধ্যে ভারী বৃষ্টিপাত হলে ঝুঁকি আবারও বাড়তে পারে। তবে কোন এলাকায় বা কত বড় পরিসরে পাহাড়ধস হবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করা, পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, পাহাড়ঘেঁষা বসতি সরিয়ে নেওয়া এবং আগাম সতর্কতা জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।














