২১ অক্টোবর ২০২৬

বড় সাজ্জাদ চক্রের ছায়া? প্রশ্নের মুখে সিএমপির সক্ষমতা

একই ছক, একের পর এক হামলা— চট্টগ্রামে চাঁদাবাজদের দাপট, আগে চাঁদা, পরে গুলি

চট্টগ্রাম নগরে ফের চাঁদার দাবিতে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এবার নগরের মুরাদপুরে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির একদিন পর এক প্রবাসীর বাড়ি লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ হতাহত না হলেও এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার ধরন আগের ‘বড় সাজ্জাদ’ চক্রের চাঁদাবাজির কৌশলের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—চট্টগ্রাম নগরে একের পর এক একই কায়দায় চাঁদাবাজি, হুমকি ও গুলির ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের ঠেকানো যাচ্ছে না কেন?

সোমবার (১০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের মুরাদপুরের হামজারবাগ লেনের ৫ নম্বর রোডে রুনা টাওয়ারের বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে।

এর আগে ওই ভবনের মালিক হাজী ইউসুফের ছেলে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী মো. শওকতের কাছে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার হুমকিও দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোস্তফা স্বপন ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী দুই যুবক রুনা টাওয়ারের নিচে যায়। তারা দারোয়ানের কাছে বাড়ির মালিকের বিষয়ে জানতে চায়। এরপর গেট লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়ে হেঁটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ভবনের মূল গেটে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাটিও নষ্ট ছিল। ফলে হামলাকারীদের শনাক্তে তদন্তকারীদের জন্য ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ডিসি হাসান মোস্তফা স্বপন বলেন, বিদেশি একটি নম্বর থেকে শওকতের কাছে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে দুজন যুবক এসে বাড়ির গেট লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলির ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে পিস্তলের গুলি বলে মনে হয়েছে।

‘টাকা না দিলে শুরু হবে খেলা’
শওকতের কাছে পাঠানো প্রায় দুই মিনিটের ভয়েস মেসেজে তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকার দাবি করে চাঁদা দাবি করা হয়।

ওই বার্তায় পরিবারের সদস্যদের অবস্থান, সন্তানদের পড়াশোনা এবং বিভিন্ন ভবনের তথ্য জানার দাবি করে বলা হয়, ৫০ লাখ টাকা দিলে নিরাপদে থাকতে পারবেন। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ‘ঘটনা’ ঘটানোর হুমকি দেওয়া হয়।

আরেকটি ভয়েস বার্তায় ৫০ লাখ টাকার পরিবর্তে এক কোটি টাকা চাওয়া হয় এবং টাকা না দিলে গুলি চালানোর হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনার পর শওকতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ভবনেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

একই কায়দা, বারবার চাঁদাবাজি
সিএমপির এই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুরাদপুরের ঘটনাটির হুমকির ধরন আগের ‘বড় সাজ্জাদ’ চক্রের চাঁদাবাজির ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। এর আগে বিদেশি নম্বর থেকে তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

পুলিশও ওই ঘটনায় ‘বড় সাজ্জাদ’-এর অনুসারীদের সম্পৃক্ততার কথা বলেছিল। কিন্তু ঘটনার সেখানেই শেষ হয়নি। প্রায় দুই মাসের মাথায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি একই বাড়িতে ফের গুলি চালানো হয়। তখন বাড়িটিতে পুলিশের পাহারা ছিল। অর্থাৎ প্রথম হামলার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও হামলাকারীরা ফের সেখানে গুলি চালাতে সক্ষম হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ ‘বড় সাজ্জাদ’-এর সহযোগী রায়হান ও বোরহানের সম্পৃক্ততার সন্দেহের কথা জানিয়েছিল এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানোর কথা বলেছিল।

গত ১৩ জুলাই নগরের চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

এর আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। চাঁদা না পেয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কথিত ডেভিড ইমনের অবস্থান নিয়ে তখনও পুলিশের কাছে নিশ্চিত তথ্য ছিল না।

পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেন।

এদিকে ‘বড় সাজ্জাদ’ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। মে মাসে দুই সহযোগীকে পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দাবি করেছিল, ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাড়িতে গুলি ও একটি হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন—সিএমপি পারছে না কেন?
একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এখন চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রথমে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন। এরপর মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হত্যার বা গুলি করার হুমকি। এরপর বাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে অস্ত্রধারীদের হামলা—সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এমন একটি অভিন্ন প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আগের ঘটনাগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী শিক্ষা নিয়েছে?
স্মার্ট গ্রুপের বাড়িতে দুই দফা হামলা, এমনকি পুলিশের পাহারার মধ্যেও গুলির ঘটনা ঘটেছে। এরপরও একই ধরনের কৌশলে মুরাদপুরে চাঁদার হুমকির পর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে এবারের ঘটনায় বিদ্যুৎ না থাকা এবং ভবনের সিসিটিভি নষ্ট থাকার সুযোগ নিয়েছে হামলাকারীরা। প্রশ্ন উঠছে—অপরাধীরা যদি ভুক্তভোগীর পারিবারিক তথ্য, ভবনের অবস্থান ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে আগেই জানতে পারে, তাহলে এসব তথ্য তাদের হাতে যাচ্ছে কীভাবে?

আরও প্রশ্ন—চাঁদাবাজির হুমকি পাওয়ার পরপরই কেন ভুক্তভোগীকে কার্যকর নিরাপত্তা দেওয়া হলো না? একই ধরনের ঘটনায় ব্যবহৃত বিদেশি নম্বর, ভয়েস মেসেজ, অস্ত্র ও হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত তদন্ত হচ্ছে কি না?

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে ‘বড় সাজ্জাদ’ ও তার সহযোগীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিভিন্ন ঘটনায় তাদের নাম উঠে আসার পাশাপাশি পুলিশও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে।

কিন্তু একের পর এক একই কৌশলে চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনা ঘটতে থাকলে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট কি না—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

মুরাদপুরের গুলির ঘটনায় এবার কি মূল হোতাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে সিএমপি, নাকি আগের ঘটনাগুলোর মতোই তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন হামলাকারী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ