২১ অক্টোবর ২০২৬

১৮ মাসে ১৪০ কোটি পরিশোধের শর্ত!

চট্টগ্রামের ডিসি হতে ৭০ কোটি টাকার চুক্তি, রহস্যঘেরা ১৬.৫০ কোটি টাকার চেকের নথি!

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ পেতে ৭০ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। কথিত চুক্তি, ব্যাংকের চেক ও ব্যক্তিগত বার্তালাপের কিছু নথি পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।

তবে চট্টগ্রামের ডিসি পদটি বাস্তবে অর্থের বিনিময়ে কেনাবেচা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নথিতে থাকা কিছু দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমেদ গত বছরের শেষ দিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি হন। এর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৪ কোটি টাকার ঋণ, নিরাপত্তায় দুই চেক
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের ২৪ নভেম্বর ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি চুক্তি করেন সালাহউদ্দিন। এতে শাকিল খানের কাছ থেকে ৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

কথিত ব্যবসায়িক সুযোগ ও চট্টগ্রাম বন্দরের কাজের সঙ্গে ওই ঋণের সম্পর্ক ছিল বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে। ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সিটি ব্যাংকের দুটি চেক দেওয়া হয়, যার প্রতিটির মূল্য ২ কোটি টাকা।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সালাহউদ্দিনকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে বদলির আদেশ দেয়। ২৩ ডিসেম্বর তিনি সেখানে যোগ দেন।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষে পরিচালক পদে কোনো শূন্য পদ ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ৮ জানুয়ারি প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে তাকে কন্ট্রোলার অব স্টোরস পদে পদায়ন করা হয়।

কথিত হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় অসন্তোষ
এরপর সালাহউদ্দিনের সঙ্গে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কথিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের নথি সামনে আসে। সেখানে তিনি পাওয়া পদ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

কথোপকথনে তাকে বলতে দেখা যায়, তাকে একটি নির্দিষ্ট পদ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে অন্য পদে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তিনি নিজেকে ‘নিঃস্ব’ বলেও উল্লেখ করেন বলে নথিতে দাবি করা হয়েছে।

ওই বার্তালাপে সালাহউদ্দিন তার বদলির আদেশের পেছনে কার ভূমিকা ছিল, তা জানেন বলেও দাবি করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় কিংবা তিনি আদৌ নিয়োগে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডিসি হতে কথিত ৭০ কোটি টাকার চুক্তি বন্দর কর্তৃপক্ষে পদায়নের পরও চট্টগ্রামের ডিসি হওয়ার চেষ্টা চলছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

গত ২৯ মার্চের একটি লিখিত ঘোষণায় সালাহউদ্দিন চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পেলে দায়িত্ব পালনে তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন। একই নথিতে পটুয়াখালীর বাউফলের মো. হাবিবুর রহমানকে প্রতিনিধি নিয়োগের কথা বলা হয়।

নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সালাহউদ্দিনের পক্ষে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল হাবিবুর রহমানকে। এরপর ১৬ জুলাইয়ের একটি নথিতে সালাহউদ্দিনের কথিত স্বাক্ষর পাওয়া যায়। সেখানে চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগের সঙ্গে ৭০ কোটি টাকার একটি চুক্তির উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, কথিতভাবে পদটি পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধের কথা ছিল।

তবে ‘কাজের মাধ্যমে’ কীভাবে ওই অর্থ উপার্জন করা হবে, তা নথিতে স্পষ্ট করা হয়নি। একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এমন অর্থ উপার্জন কীভাবে আইনসঙ্গত হবে এবং অর্থের চূড়ান্ত প্রাপক কে— সেসব বিষয়েও কোনো ব্যাখ্যা নেই।

১৬.৫০ কোটি টাকার ১২ চেক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কথিত পদ পাওয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে আরও বড় অঙ্কের আর্থিক নিশ্চয়তার নথিও পাওয়া গেছে। পর্যালোচনা করা নথিতে সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১২টি চেকের উল্লেখ রয়েছে। এসব চেকের মোট মূল্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের বগুড়া করপোরেট শাখার পাঁচটি চেকের মোট মূল্য ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর সিটি ব্যাংকের সাতটি চেকের মূল্য ৫ কোটি টাকা। এসব চেক কথিত লেনদেনের নিরাপত্তা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সালাহউদ্দিনের সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত চাকরির তথ্যসংবলিত কাগজপত্র এবং তার বোন জিনিয়াত খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার, পরে কিছু বিষয়ে স্বীকারোক্তি
অভিযোগের বিষয়ে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। তার দাবি, মোবাইল ফোন হ্যাক হয়েছিল এবং তার চেক ও জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গিয়েছিল।

তবে পরে তিনি স্বীকার করেন, সচিবালয়ে বিভিন্ন পক্ষ কর্মকর্তাদের কাছে নিয়মিত নানা ধরনের প্রস্তাব নিয়ে যায়। যদিও কোনো পদ পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেননি।

এসব বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এসব বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু নেওয়া উচিত ছিল। এটা আমার ভুল।’

আমলাতন্ত্রের ভেতরে কথিত তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষ নিয়মিত সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের কক্ষে কক্ষে গিয়ে নানা প্রস্তাব দেয়। এ ধরনের ঘটনা সেখানে সব সময়ই ঘটে এবং এখনো ঘটছে। এটা অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই।’

তবে এসব মধ্যস্থতাকারী কারা, তারা কোনো কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেছিলেন কি না এবং নিয়োগে তাদের আদৌ কোনো প্রভাব ছিল কি না, সে বিষয়ে নথিপত্রে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সালাহউদ্দিনের চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি, বিভিন্ন চুক্তি, আর্থিক নিশ্চয়তা এবং কথিত বার্তালাপের বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, একটি অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে তদন্ত কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ