২১ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্ব মশা দিবস

কোটি কোটি টাকা খরচ, তবু চট্টগ্রামে কমেনি মশার দাপট

মশা মারতে কোটি কোটি টাকা খরচ, ৩৫৫ কর্মীর বহর, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর দাবি— তারপরও চট্টগ্রাম নগরীতে মশার দাপট কমছে না। বরং বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপে নগরীর একাধিক এলাকায় এডিসের লার্ভার ঘনত্ব মিলেছে নিরাপদ মাত্রার কয়েকগুণ বেশি। ফলে মশক নিধনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রশ্ন উঠেছে কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে।

আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে চট্টগ্রামে মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নগরবাসীর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন তিনজন। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬৩ জন।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণও দ্রুত বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৬ জনে। ওই মাসে মারা যান দুজন। আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৬৩ জন।

চট্টগ্রামে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৬৪০ জন, ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৩ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন।

জরিপে এডিসের ভয়াবহ চিত্র
মশার প্রকোপের সঙ্গে ডেঙ্গু বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে নগরীতে এডিস মশার উচ্চঘনত্বকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা জরিপে নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে এডিসের লার্ভার উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।

৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টি বাড়িতে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়।

জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নিরাপদ মাত্রা যেখানে ৫ শতাংশের নিচে। ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে জরিপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে জমিয়ে রাখা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনকে এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় ৫ কোটি ৫০ লাখ
ডেঙ্গু বাড়লেও মশক নিধনে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের কমতি নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণে চসিকের মোট ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

তারপরও নগরীর চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশার উপদ্রব কমেনি।

৭০ লাখ মানুষের জন্য ৩৫৫ কর্মী
চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সিটি করপোরেশনের দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হয় না; কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনেও মশক নিধনকর্মীদের দেখা যায় না।

চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, নগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে মাত্র সাড়ে তিনশো কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মতে, পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই ফগার মেশিনে ধোঁয়া দেওয়ার পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, কোথায় প্রজননস্থল এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব তথ্য নিয়মিত পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, ‘চসিকের মশা নিধন কার্যক্রমে বড় ঘাটতি হলো কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা না থাকা। বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ছাড়া বড় বাজেট বরাদ্দ করেও কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন।’

নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কোন ওষুধে লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা কার্যকরভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা প্রয়োজন।’

চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। পাশাপাশি ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।’

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ