২৩ অক্টোবর ২০২৬

বয়স-অভিজ্ঞতার শর্ত ভেঙে নিয়োগ

শর্ত ভেঙে নিয়োগের অভিযোগ, সিডিএ’র আবু ঈসা আনছারীকে ঘিরে বিস্তর অভিযোগ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (সিডিএ) নিয়োগ, পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ একটি নিয়োগ-সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি সুবিধাভোগী হয়েছেন— এমন অভিযোগও রয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল সিডিএর ‘প্রিপারেশন অব ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ফর চিটাগাং মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান’ প্রকল্পে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে শিক্ষানবিশ নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে যোগ দেন আবু ঈসা আনছারী।

এরপর ২০০৭ সালের ১০ জুলাই একটি দৈনিকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ পদে আবেদন করেন তিনি। বিজ্ঞপ্তিতে এ পদের জন্য নগর পরিকল্পনায় স্নাতক ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই আবেদন করার সময় আবু ঈসা তাঁর জীবনবৃত্তান্তে বয়স উল্লেখ করেন ৩০ বছর ২২ দিন। অভিজ্ঞতার অংশে তিনি দাবি করেন, ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল থেকে সিডিএর বাস্তবায়নাধীন ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রকল্পে টাউন প্ল্যানার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। একই বছরের ২২ নভেম্বর তিনি চুক্তিভিত্তিক সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে ‘অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে’ নিয়োগ পান।

বয়স-অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন
এর এক বছর পর, ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই নগর পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য আবার বিজ্ঞপ্তি দেয় সিডিএ। বিজ্ঞপ্তিতে নগর পরিকল্পনাবিদ পদের জন্য নগর পরিকল্পনায় স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে কমপক্ষে ছয় বছরের অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়সের শর্ত দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব শর্ত পূরণ না করেই আবু ঈসা আনছারী ওই পদে আবেদন করেন। ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে তাঁর বয়স উল্লেখ করা হয় ৩১ বছর ১৫ দিন। আর অভিজ্ঞতার অংশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ছয় বছর ১৫ দিনের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রকৃত অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় তিন বছর তিন মাস। অথচ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাই গণনার কথা বলা হয়েছিল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা যুক্ত করে যোগ্যতা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপরও ওই নিয়োগ নিয়ে তৎকালীন নিয়োগ বোর্ড কোনো আপত্তি তোলে না এবং ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর আবু ঈসা আনছারী নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পান।

জীবনবৃত্তান্তে অভিজ্ঞতার হিসাব নিয়েও অভিযোগ
২০০৮ সালের জীবনবৃত্তান্তে আবু ঈসা আনছারী ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর থেকে ‘অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে’ সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ২০০৮ সালের ৭ এপ্রিল থেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং ওই বছরের ২৯ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত প্রধান পরিকল্পনাবিদ বিদেশে থাকাকালে ভারপ্রাপ্ত নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল থেকে ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সিডিএর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রকল্পে নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করার দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি ২০০২ সালের ১০ জুলাই থেকে ২০০৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেট্রো মেকার্স ডেভেলপার্স লিমিটেডে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও দেখানো হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা গণনার সুযোগ না থাকলেও তা যোগ করে যোগ্যতা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তথ্য গোপন বা জালিয়াতির অভিযোগ হিসেবে দেখছেন।

নিয়োগপত্রের শর্তেও বলা ছিল, কোনো আবেদনকারী সত্য গোপন করে প্রতারণামূলকভাবে তথ্য বা সনদ দিলে তাঁর নিয়োগ বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এমন শর্ত থাকার পরও আবু ঈসা আনছারীর বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

২০০৯ সালেই উঠেছিল নিয়োগ বাতিলের দাবি
সিডিএতে নিয়োগের অনিয়ম, চলতি দায়িত্ব বাতিল এবং পদমর্যাদা অনুযায়ী গ্রেডেশন লিস্ট প্রণয়নের দাবি জানিয়ে ২০০৯ সালে আবেদন করেছিলেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ওই অভিযোগে বলা হয়, মাহফুজুর রহমান নবম গ্রেডের কর্মকর্তা হলেও ২০০৮ সালে সিডিএ ষষ্ঠ গ্রেডের পদে কয়েকজনকে নিয়োগ দেয়। তাঁদের মধ্যে আবু ঈসা আনছারীও ছিলেন। অভিযোগে সরকারি প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত বয়স ও অভিজ্ঞতার শর্ত অমান্য করে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ও কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

মাহফুজুর রহমানের অভিযোগ ছিল, বয়স ও চাকরির অভিজ্ঞতায় জুনিয়র হয়েও আবু ঈসা আনছারী উচ্চতর পদে অবস্থান করছেন। এতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পদমর্যাদা ও বেতন স্কেলের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নবসৃষ্ট পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এলইউসি অনুমোদনেও অনিয়মের অভিযোগ
নিয়োগ বিতর্কের পাশাপাশি আবু ঈসা আনছারীর বিরুদ্ধে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বা ল্যান্ড ইউজ ক্লিয়ারেন্স (এলইউসি) অনুমোদনেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের এলইউসি অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন এবং নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সিডিএ কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের তালিকা আরও দীর্ঘ
ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারীর বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদোন্নতির অনিয়মের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, ভূমি ব্যবহার সনদ ও নকশা অনুমোদনে অনিয়ম, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, জলাধার ভরাটের অনুমোদনে প্রভাব খাটানো এবং প্রায় ৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে— এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, সিডিএর কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে কিংবা অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাঁদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। মাহফুজুর রহমান ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সিডিএ কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারীর বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগের কথা তিনিও শুনেছেন। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।’ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিকভাবে কী করণীয়, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিডিএর ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন