২৩ অক্টোবর ২০২৬

নকল মোড়ক ও মানহীন পণ্যে উদ্বেগ

চট্টগ্রামের বাজারে ভেজাল ‘ঘি’র ছড়াছড়ি, সামনে এলো ৫ ভয়ঙ্কর চিত্র

চট্টগ্রামের বাজারে ঘি ও বাটার অয়েলের চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে মানহীন ও ভেজাল পণ্যের ঝুঁকিও। নগরীর খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার, বাকলিয়া, বায়েজিদসহ বিভিন্ন বাজারে ঘি ও বাটার অয়েলের নামে নানা ধরনের পণ্য বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতীতের বিভিন্ন অভিযানে নকল মোড়কে ভেজাল ঘি বাজারজাতের ঘটনাও ধরা পড়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্যাকেটের গায়ে ‘খাঁটি’, ‘দেশি’, ‘গাওয়া’ কিংবা ‘স্পেশাল’ লেখা থাকলেই কোনো ঘি নিরাপদ বা মানসম্মত— এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্য কেনার আগে অনুমোদন, সঠিক লেবেল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং উপাদানের তথ্য যাচাই করা জরুরি।

চট্টগ্রাম বিএসটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘি ও বাটার অয়েল নির্ধারিত মানের আওতাভুক্ত পণ্য। ফলে এসব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি ও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

ঘির বদলে তেল ও বনস্পতি
ভেজাল ঘির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো দুধের চর্বি বা মিল্ক ফ্যাটের পরিবর্তে পাম অয়েল, পাম অলিন কিংবা বনস্পতি ব্যবহার। সাম্প্রতিক বিএসটিআই পরীক্ষায় একটি ব্র্যান্ডের ‘ঘি’তে মিল্ক ফ্যাট না পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পরীক্ষায় ওই পণ্যে পাম অলিন ও বনস্পতি ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ নাম ও মোড়কে ঘি লেখা থাকলেও ভেতরের উপাদান যদি ঘির নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

কৃত্রিম রং-সুগন্ধিতে ‘ঘি’র স্বাদ
ঘির স্বাভাবিক রং, গন্ধ ও বৈশিষ্ট্য তৈরি করতেও কোথাও কোথাও কৃত্রিম উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে অতীতে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযান ও অনুসন্ধানে পাম অয়েল, ডালডা, সুজি, কৃত্রিম রং ও সুগন্ধি ব্যবহার করে ঘি তৈরির তথ্য উঠে এসেছে।

ফলে শুধু রং, গন্ধ কিংবা স্বাদ দেখে আসল-নকল ঘি চেনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। দেখতে ও গন্ধে আকর্ষণীয় হলেও পণ্যের ভেতরের উপাদান ভিন্ন হতে পারে।

নকল বিএসটিআই সিলেও প্রতারণা
ভেজাল পণ্য বাজারজাতের আরেকটি কৌশল হিসেবে উঠে এসেছে নকল বা বিভ্রান্তিকর বিএসটিআই তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অতীতে নকল বিএসটিআই সিল ব্যবহার করে ঘি বাজারজাতের ঘটনাও ধরা পড়েছে।

এ কারণে শুধু প্যাকেটে বিএসটিআইয়ের লোগো দেখেই নিশ্চিন্ত না হয়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের অনুমোদন ও লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

নেই উৎপাদন-মেয়াদ বা উপাদানের সঠিক তথ্য
কিছু নিম্নমানের বা অনুমোদনহীন পণ্যের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, প্রস্তুতকারকের পূর্ণ ঠিকানা কিংবা উপাদানের সঠিক বিবরণ থাকে না— এমন অভিযোগও রয়েছে।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এসব তথ্য না থাকায় ভোক্তারা পণ্যের নিরাপত্তা ও মান সম্পর্কে সঠিক ধারণা পান না। ফলে সন্দেহজনক বা অসম্পূর্ণ তথ্যযুক্ত পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

বাটার অয়েলের নামেও মানহীন পণ্য
শুধু ঘি নয়, বাটার অয়েল নিয়েও নজরদারি জরুরি। বিএসটিআইয়ের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাটার অয়েলও নির্ধারিত মানের একটি পৃথক পণ্য।

তাই বাটার অয়েল কেনার সময়ও পণ্যের অনুমোদন, উপাদান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও লেবেল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাজারে ঘি ও বাটার অয়েলের নামে নিম্নমানের পণ্য ঢুকে পড়লে ভোক্তা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।

চট্টগ্রামে আগেও ধরা পড়েছে ভেজাল ঘির কারখানা
চট্টগ্রামে ভেজাল ঘি তৈরির ঘটনা নতুন নয়। নগরীর বায়েজিদ এলাকায় অতীতে জেলা প্রশাসনের অভিযানে একটি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে ভেজাল ঘি তৈরি এবং প্যাকেটে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার, বাকলিয়া ও বায়েজিদ এলাকাতেও বিভিন্ন সময়ে ভেজাল ঘি তৈরির কারখানা নিয়ে অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

২০২৫ সালেও চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন ঘি তৈরির অভিযোগ সামনে আসে। তখন বিএসটিআই কর্মকর্তারা অনুমোদনহীন ঘি কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

অভিযান চলছে, প্রয়োজন নিয়মিত পরীক্ষা
চট্টগ্রাম বিএসটিআই কার্যালয় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের ৪ জুন চট্টগ্রাম মহানগরীতে পরিচালিত একটি অভিযানে তিনটি মামলায় মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। বিএসটিআই জানিয়েছে, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান ও জরিমানা করলেই বাজার থেকে ভেজাল পণ্য নির্মূল করা সম্ভব নয়। নিয়মিতভাবে বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, অনুমোদনহীন কারখানা শনাক্ত, নকল মানচিহ্নের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করাও জরুরি।

ঘি কিনতে ভোক্তাদের সতর্কতা
ঘি বা বাটার অয়েল কেনার সময় ভোক্তাদের প্যাকেটের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি প্রস্তুতকারকের পূর্ণ ঠিকানা, উপাদানের তালিকা এবং অনুমোদন ও মানচিহ্নের তথ্য যাচাই করতে হবে।

অস্বাভাবিক কম দামের পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্যাকেট অস্বাভাবিক ফুলে গেলে, লিকেজ থাকলে কিংবা পণ্যের গন্ধ বা রং অস্বাভাবিক মনে হলে সেটি না কেনাই ভালো। সন্দেহজনক পণ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার পরামর্শও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএসটিআইয়ের সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বলেন, জাতীয় মান অনুসারে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা প্রতিটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।

কোনো প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বিএসটিআই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিএসটিআই পণ্যের মান সনদ দেওয়ার পাশাপাশি নকল ও ভেজাল ঠেকাতে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে।

পণ্য কেনার আগে বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন, লাইসেন্স নম্বর, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, পণ্যের উপাদান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার জন্য ক্রেতাসাধারণকে পরামর্শ দেন বিএসটিআই মহাপরিচালক।

নিয়মিত পরীক্ষার দাবি
চট্টগ্রামের মতো বাণিজ্যিক নগরীতে ঘি ও বাটার অয়েলের বড় বাজার রয়েছে। এই বাজারে বৈধ ও মানসম্মত পণ্যের পাশাপাশি ভেজাল, নকল ও অনুমোদনহীন পণ্য ঢুকে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ভোক্তারা।

তাই শুধু মোড়ক দেখে নয়, পণ্যের প্রকৃত মান যাচাই করেই খাদ্যপণ্য বাজারজাত ও কেনাবেচা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজার থেকে নিয়মিত ঘি ও বাটার অয়েলের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা এবং সেই ফলাফল প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

এতে একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা সতর্ক হবে, অন্যদিকে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ভোক্তাদের আস্থাও বাড়বে।

আরও পড়ুন