২১ অক্টোবর ২০২৬

সহজ ঋণের প্রলোভন, তারপর তথ্যের ফাঁদ

৩১ অবৈধ অ্যাপে লেনদেন না করতে সতর্ক করল বিএফআইইউ

সহজ শর্তে দ্রুত ঋণের প্রলোভন। মোবাইল ফোনে একটি অ্যাপ ডাউনলোড, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও ব্যাংক হিসাবের বিবরণ দেওয়া— তারপরই মিলছে ঋণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই ‘সহজ ঋণ’ই পরিণত হতে পারে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি ও ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে। এমন পরিস্থিতিতে অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ডিজিটাল ঋণ কার্যক্রম থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দেওয়া এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের নজরে এসেছে এমন ৩১টি মোবাইল অ্যাপ, যেগুলোর মাধ্যমে অনুমোদনহীন ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ না নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য না দেওয়ার জন্যও জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে।

ঋণের নামে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ
বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে।

এসব অ্যাপ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোনে থাকা যোগাযোগের তালিকা, ছবি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করছে। পরে ঋণ আদায়ের নামে গ্রাহকের ওপর অযাচিত চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে বিএফআইইউ।

অর্থাৎ, ঋণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এসব প্ল্যাটফর্মের ঝুঁকি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও এতে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অনুমোদন ছাড়া ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই
বিএফআইইউ স্পষ্ট করেছে, বাংলাদেশে ঋণ প্রদান একটি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কার্যক্রম। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ও প্রচলিত আইন-বিধি অনুসরণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা বৈধ নয়।

সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের অনুমোদনহীন ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতারণা, আর্থিক অপরাধ ও অর্থপাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় প্রতারণামূলক ঋণ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং শাস্তির বিধান রয়েছে।

আগাম টাকা চাইলেই সতর্ক
ডিজিটাল ঋণ প্রতারণার অন্যতম কৌশল হচ্ছে ঋণ দেওয়ার আগেই বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করা। ‘নিবন্ধন ফি’, ‘প্রসেসিং ফি’, ‘সিকিউরিটি মানি’, ‘ফাইল চার্জ’ কিংবা অন্য কোনো নামে অগ্রিম অর্থ চাওয়া হতে পারে।

বিএফআইইউ এ ধরনের কোনো অর্থ না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে কোনো অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যদি ঋণ দেওয়ার আগেই অর্থ দাবি করে, তাহলে সেটিকে প্রতারণার সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

‘কন্টাক্ট লিস্ট’ও হয়ে উঠছে অস্ত্র
অনলাইন ঋণ প্রতারণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যবহারকারীর মোবাইল ফোনের যোগাযোগের তালিকা ও ছবি সংগ্রহ।

ঋণ নেওয়ার সময় অনেক অ্যাপ ফোনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চায়। ব্যবহারকারী অনুমতি দিলে প্রতারক চক্র তার পরিচিতজনদের নাম-নম্বর, ছবি বা অন্যান্য তথ্য হাতে পেতে পারে। পরে ঋণের টাকা পরিশোধে চাপ সৃষ্টি করতে এসব তথ্য ব্যবহার করে পরিচিতজনদের কাছে ফোন করা, অপমান করার ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এমন ডিজিটাল ঋণ প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে।

৩১ অ্যাপের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি
বিএফআইইউর সতর্কবার্তায় ৩১টি অ্যাপের মাধ্যমে অনুমোদনহীন ঋণ কার্যক্রমের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে ২৭ আগস্ট প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তালিকার নাম প্রকাশের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা গেছে।

একটি প্রকাশিত তালিকায় সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্তো লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওনজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাড়ি, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডো, বংক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সোজা লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও তাকানাও-সহ অ্যাপের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএফআইইউর মূল সতর্কবার্তায় ৩১টি অ্যাপের নাম আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

তাই তালিকাটি পত্রিকায় প্রকাশের আগে বিএফআইইউর মূল বিজ্ঞপ্তি থেকে নামগুলো পুনরায় যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে একই বা কাছাকাছি নামের একাধিক অ্যাপ থাকায় সাধারণ ব্যবহারকারীর বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‘সহজ ঋণ’ কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ?
প্রচলিত ব্যাংক বা অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পেতে সাধারণত পরিচয় যাচাই, আয়-ব্যয়ের তথ্য, ঋণের উদ্দেশ্য, পরিশোধ সক্ষমতা এবং অন্যান্য নথিপত্র যাচাই করা হয়। কিন্তু অবৈধ ডিজিটাল ঋণদাতারা এসব প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত ঋণের প্রলোভন দেখাতে পারে।

এ কারণে আর্থিক সংকটে থাকা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেছেন, এসব অ্যাপ মূলত আর্থিক সংকটে থাকা এবং সাইবার প্রতারণা সম্পর্কে কম জানা মানুষকে টার্গেট করে।

ঋণের পাশাপাশি চলছে অন্যান্য ডিজিটাল প্রতারণা
ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্র এখন শুধু ঋণ দেওয়ার অ্যাপেই সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন বিনিয়োগ, শেয়ার বা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের নামে দ্রুত মুনাফার প্রলোভন, অনলাইন জুয়া ও বাজি এবং বিভিন্ন অনুমোদনহীন আর্থিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে অনলাইনভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতারণার বড় উদাহরণ হিসেবে এমটিএফইর (মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ) বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, ওই প্রতারণামূলক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়েছে; বাকি অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এ ধরনের ঘটনা দেখাচ্ছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অর্থ লেনদেনের আগে অনুমোদন ও বৈধতা যাচাই না করলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বড় হয়ে যেতে পারে।

কী করবেন, কী করবেন না
বিএফআইইউর সতর্কবার্তার আলোকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- প্রথমত, ঋণের প্রয়োজন হলেও অপরিচিত কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক হিসাবের বিবরণ কিংবা মোবাইল ফোনের সংবেদনশীল তথ্য দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, ঋণ দেওয়ার আগে কোনো প্রতিষ্ঠান অগ্রিম টাকা, নিবন্ধন ফি বা প্রসেসিং ফি চাইলে সতর্ক হতে হবে।

তৃতীয়ত, কোনো অ্যাপ ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, ছবি বা অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চাইলে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে হবে।

চতুর্থত, ‘দ্রুত ঋণ’, ‘কোনো কাগজপত্র লাগবে না’, ‘তাৎক্ষণিক টাকা’- এ ধরনের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অর্থ লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

পঞ্চমত, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

প্রতারিত হলে কোথায় জানাবেন?
বিএফআইইউ জানিয়েছে, কেউ এ ধরনের অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ নিয়ে প্রতারিত হলে বা কোনো অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপ, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য জানলে তা বিএফআইইউকে জানানো যেতে পারে। সংস্থাটি তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো অথবা লিখিতভাবে পরিচালক, বিএফআইইউ বরাবর তথ্য দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

নজরদারি আরও বাড়ানোর তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে অবৈধ ডিজিটাল ঋণ কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন। যেসব অ্যাপ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে, তাদের অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব চিহ্নিত করা এবং অ্যাপ পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ একটি অবৈধ ঋণ অ্যাপের পেছনে শুধু একজন প্রতারক নাও থাকতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে ভুয়া কোম্পানি, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারচক্র এবং অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক।

ফলে বিএফআইইউর ৩১টি অ্যাপ নিয়ে সতর্কবার্তা শুধু একটি তালিকা প্রকাশের বিষয় নয়; এটি দেশের ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকিরও ইঙ্গিত। এখন প্রয়োজন এসব প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি, দ্রুত তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

বিএফআইইউর মূল বার্তা একটাই- সহজ ঋণের প্রলোভনে পড়ে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, মোবাইলের যোগাযোগ তালিকা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি অপরিচিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ