২১ অক্টোবর ২০২৬

ফের টানা ছুটি

পর্যটকে মুখর কক্সবাজার, মেক্সিকান ফুডে মাতুয়ারা ভোজনরসিকরা

কক্সবাজারের প্রকৃতিতে সবুজের সতেজতা এনেছে বর্ষা। এসময়ে বৃষ্টি-মেঘ-রোদের ছটা বিমুগ্ধ করছে পর্যটকদের। এসব বিমোহিত রূপ অতীতের ‘মরা মৌসুম’র ইতিহাস ভেঙে চলতি বর্ষায় পর্যটক উপস্থিতি বাড়িয়েছে সাগরতীরে। সেই আবহে ফের টানা ছুটিতে সরকারি চাকরিজীবীসহ নানা পেশার কর্মজীবিরা আবারো ভীড় জমিয়েছে পর্যটন নগরীতে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির সাথে বৃহস্পতিবার নৈমিত্তিক বা ঐচ্ছিক ছুটি যারা নিতে পেরেছেন তাদের খাতায় যুক্ত হয়েছে সাপ্তাহিক দু’দিনের ছুটিসহ চারদিনের অবসর। এতে টানা ছুটিতে অবকাশ কাটাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন সরকারি চাকরিজীবীসহ পেশাজীবিরা। এ সুযোগে পর্যটক-দর্শণার্থীতে টই টম্বুর কক্সবাজার। ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

এদিকে, টানা ছুটিতে পর্যটক উপস্থিতির কথা মাথায় রেখে ভ্রমণপিয়াসীদের মুখরোচক রসনা বিলাসের বিনোদন দিতে তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে আয়োজন করা হয়েছে ‘মেক্সিকান ফুডস ফেস্টিভ্যাল’। ২৬ হতে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত চারদিনের আয়োজনে মেক্সিকান ফেভারিট ফুডসগুলো ‘ফুটপাতের স্ট্রিট ফুড’র দামেই অভিজাত ফ্লেভারে উপভোগ করতে পারছেন ভোজনরসিকরা। সব ক্যাটাগরির পর্যটকদের কথা চিন্তা করে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় ম্যানু সেট করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বৈচিত্রময় এ আয়োজনে প্রথমদিন থেকেই সাড়া পড়েছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, বুধবার ২৬ আগস্ট পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে নির্বাহী আদেশে একদিনের সরকারি ছুটি ছিল। ২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার একদিনের ছুটি নিয়ে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটিসহ টানা চার দিনের অবসরে ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারে পর্যটক সমাগম হয়েছে। পর্যটন জোনের প্রায় প্রতিটি হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউসসহ আবাসন প্রতিষ্ঠানে হয়েছে আগাম বুকিং। বর্ষায় কক্সবাজারের প্রকৃতি ও সমুদ্রের ভিন্ন রূপ উপভোগ করতে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে, বর্ষায় কক্সবাজারের সৌন্দর্য যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনি উত্তাল সমুদ্র হয়ে উঠতে পারে বিষাদের বিপজ্জনক কারণ। সাগর উত্তাল থাকলে গোসলে নামার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন।

কক্সবাজার হোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সরকারি ছুটি থাকলেই পর্যটকদের প্রথম পছন্দের গন্তব্য থাকে কক্সবাজার। বর্ষায় কক্সবাজারে হোটেল কক্ষ ভাড়ায় ভালোই ডিসকাউন্ট থাকে। রেস্তোরাঁয় খাবারে এবং অন্য সবখানে সেবাটা বেশি পাওয়া যায়। গরমের তীব্রতাও থাকে কম- সবমিলিয়ে এ সময়ে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

সী-নাইট হোটেলের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, এবারও বুধবার ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির পর বৃহস্পতিবার যারা ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছেন তার টানা চার দিনের অবসর নিয়ে কক্সবাজার এসেছেন। এতে পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে সমুদ্র নগরীতে।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও টুয়াক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বুধবার সরকারি ছুটি ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার অফিস খোলা থাকলেও শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ওই সময়ও চারদিনের সময় নিয়ে কক্সবাজারে পর্যটকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। এবারও টানা চার দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের চাপ বেড়েছে কক্সবাজারে। এতে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটনকেন্দ্র ও সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরছে।

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, চলতি মাসে গণঅভ্যুত্থান দিবসের মতো ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটিতেও আমাদের হোটেলে বুকিং ভালোই বলা চলে। পর্যটন বিকাশে আমরা আগত ভ্রমণপিয়াসিদের ভিন্ন ভাবে বিনোদিত করতে বছরজুড়েই থাকে নানা উৎসবের আয়োজন। জৈষ্ঠ্য মাসে দেশীয় ফ্রুটসের ফেস্টিভ্যাল করে পানির দরে পর্যটক ও স্থানীয় সবাইকে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। এবারের টানা বন্দে আমরা চারদিনের মেক্সিকান ফুড ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করেছি। কেসাডিয়া, গুয়াকামোল, টর্টিয়া কিংবা সুস্বাদু নাচোস-মেক্সিকোর অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী এসব খাবারের চেনা স্বাদ এখন পাওয়া যাচ্ছে সমুদ্রশহরেই।

তিনি আরো বলেন, অনেকের ধারণা থাকে, তারকা মানের হোটেল মানেই অতিরিক্ত চড়া দামের খাবার। সেই ভুল ধারণা ভাঙতেই সর্বসাধারণের নাগালে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যেই ভোজনরসিকরা উপভোগ করতে পারছেন মেক্সিকোর বাহারি সব খাবার। পাশাপাশি শিশুদের জন্যও রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

হোটেলের এক্সিকিউটিভ সেফ মুহাম্মদ ইরফান হোসাইন বলেন, ভ্রমণপ্রেমীরা বৈচিত্র্য পছন্দ করে- এটা বুঝতে পারছি ফেস্টিভ্যালে সব বয়সী মানুষের সাড়ায়। মঙ্গলবার ফেস্টিভ্যাল উদ্বোধনের আগেই অনেক পর্যটক মেক্সিকান খাবারের স্বাদ নিতে ভিড় জমান।

নারায়াণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকা থেকে আসা পর্যটক ইসমত জাহান বলেন, রাস্তার ধারের স্ট্রিট ফুড যে দামে মিলে তারই সমান দামে স্বাস্থ্যকর ও মনোরম পরিবেশে বিদেশী খাবার মিলছে-সেটা দেখে স্বাদ আস্বাদন করে দেখলাম। বার বার শুনেছি, কক্সবাজারে সমুদ্র দেখা, হোটেলে ঘুমানো ছাড়া বৈচিত্রময় কিছু মিলে না। কিন্তু ওশান প্যারাডাইসের এ আয়োজন সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। সাশ্রয়ী দামে বিদেশী খাবার টেস্ট করার সুযোগ পেয়ে ঘুরতে আসা পরিবারের সবাই খুশি।

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের রামুর পেঁচারদ্বীপস্থ মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রানা কর্মকার বলেন, ইকো রিসোর্ট হিসেবে আমরা সারাবছরই কমবেশী বুকিং পায়। যেকোন বন্দে একটু চাপ থাকে। এবারও ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং হয়েছে।

একই ধরণের বুকিং হয়েছে তারকা হোটেল সায়মন, রামাদা, সী প্যারাডাইস, প্রাসাদ প্যারাডাইস, লং বিচ, কক্স টু ডে, বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ, গ্রান্ড প্যাসিফিক, গ্রীণ ন্যাচারসহ সব তারকা ও নন তারকা হোটেল, গেস্ট হাউজ ও কটেজে।

সৈকতে বিপদাপন্ন পর্যটকের উদ্ধারে কাজ করা সী সেইফ লাইফগার্ডের সিনিয়র কর্মী ওসমান গণি বলেন, এবারের পর্যটন মৌসুমটা ভিন্ন যাচ্ছে। অতীতে এসময় পর্যটক থাকতো হাতেগোনা। কিন্তু এবার কোরবানির ঈদের পর হতে প্রতি সপ্তাহিক বন্দে উল্লেখ করার মতো পর্যটক আসছে। টানা বন্দে এটি দিগুণ হয়। বুধবার হতে পর্যটকে সরগরম অবস্থা চলছে। এতে আমাদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু বিকেলে নয়, এখন সকালের স্নিগ্ধ সময়েও জনকোলাহল বাড়ে।

সি সেইফ লাইফগার্ডের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্ষায় সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা গেলেও পানিতে নামার ক্ষেত্রে লাইফগার্ডদের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে। লাল পতাকা টানানো থাকলে কোনোভাবেই পানিতে নামা উচিত নয়। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করে পর্যটকদের গোসলে নামা উচিত। সচেতন না হলে, আনন্দ ভ্রমণ মুহুর্তে বিষাদে রূপ রিতে পারে। মঙ্গলবার সামান্য ভুলে ঢাকার দু’সহকর্মী স্রোতে ভেসে যায়। একজনকে উদ্ধার করা গেলেও অপরজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, সব মিলিয়ে কয়েক বছর আগের কক্সবাজারের বর্ষাকালীন পর্যটনচিত্র এখন আর আগের মতো নেই। একসময় যে মৌসুমকে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ খরার সময় হিসেবে দেখতেন, সেই বর্ষাই এখন নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। বৃষ্টিভেজা সৈকত, মেঘলা আকাশ, উত্তাল ঢেউ, মেরিন ড্রাইভের সবুজ পাহাড় আর সাগরের মিলনে বর্ষার কক্সবাজার প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য হয়ে উঠছে ভিন্ন এক গন্তব্য।

এদিকে, লোকারণ্য পর্যটক-দর্শণার্থীদের নিরাপত্তায় সর্তক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছেন ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। মোতায়েন রয়েছে অতিরিক্ত পুলিশও। মাঠে টহল দিচ্ছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমান আদালত। যেকোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলকোচ আরো বাড়ানোর পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করা, পর্যটনকেন্দ্রের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা জোরদার এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া গেলে কক্সবাজার শুধু শীতের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকবে না। বছর জুড়েই সমুদ্রনগরী পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকবে এমনটি প্রত্যাশা করাই যায়।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) আজমল হোসেন বলেন, আমাদের প্রথম এবং মুখ্য কাজ হচ্ছে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- সে লক্ষ্যে নিয়মিত তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে টুরিস্ট পুলিশ।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, পর্যটন জোনের সুগন্ধা-লাবনী-কলাতলী পয়েন্টে লোক সমাগম একটু বেশী। তবে, সবপয়েন্টে পর্যটক উপস্থিতি চিন্তা করে তথ্যকেন্দ্র সচল রয়েছে। পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মাঠে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, বিপুল লোকসমাগম মাথায় নিয়ে সর্তকায় দায়িত্বপালন করছে পুলিশ। অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধে, পোশাকধারীর পাশাপাশি সাদা পোশাকে এবং পর্যটক বেশেও পুলিশের সদস্যরা ঘুরছেন। টহলে রয়েছে এলিট ফোর্স র‌্যাবও।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ