একদিকে স্বামী হত্যার শোক, অন্যদিকে সেই হত্যার আসামির পরিবারের করা মামলায় কারাবন্দি। কোলের দেড় বছরের শিশুটিও সঙ্গে। মাকে হারিয়ে ঘরছাড়া হয়েছে অপর দুই সন্তান। তাদের কেউ নেই মায়ের মতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার। তাই মায়ের জন্য কাঁদছে ছোট্ট দুই শিশু। স্বামী হারানোর পর সন্তানদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেন এক অসহায় জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন কক্সবাজারের মহেশখালীর ফাতেমা বেগম।
অভিযোগ, স্বামী মোহাম্মদ কাশেমকে হত্যার মামলায় আসামি রাসেলের পরিবারের করা ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম। তবে ওই মামলার কয়েকজন কথিত সাক্ষীই দাবি করেছেন, তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও ভাষ্য, মামলায় উল্লেখ করা ২০২৫ সালের ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের অভিযোগ, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপের মুখে ফেলতেই উল্টো এই মামলা করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়ার কবির বাজারে কথা কাটাকাটির জেরে মোহাম্মদ কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের স্ত্রী ফাতেমা বেগম পরদিন রাসেলসহ ১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার চার নম্বর আসামি রাসেল।
কাশেম হত্যার প্রায় এক মাস পর, ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন রাসেলের মা নুর জাহান বেগম। ওই অভিযোগে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ সাতজনকে আসামি করার আবেদন করা হয়।
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। মামলাটির তদন্ত করেন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে তিনি ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন।
তবে তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরেই উঠেছে নানা প্রশ্ন। আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাদীর দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বাইরে আর কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। এমনকি সাত সাক্ষীর বক্তব্যেও দাড়ি, কমা ও সেমিকোলনসহ প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে বাদিনীর দেখানো মতে জায়গাটি পরিদর্শন করেন, আলামত জব্দের চেষ্টা করেন, বাদিনীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন। বিবাদীদের নাম-ঠিকানা যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রকাশ্যে ও গোপনে তদন্ত এবং গুপ্তচর নিয়োগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে আর কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, সেটিই তদন্তে দেখা হয়েছে এবং সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে রাসেলকে কাশেম হত্যা মামলায় ‘অন্যায়ভাবে’ আসামি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে— এমন প্রশ্নের জবাবে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘এরকম লেখার কোনো সুযোগ নেই, আগের ঘটনা তাই আমার মনে পড়ছে না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদরা নুর জাহান বেগমের বাড়িঘর ভাঙচুর করে বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যান। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রতিবেদনের আরেক অংশে বলা হয়, নুর জাহান বেগমের বাড়ির পাশে সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় তার ছেলে মোহাম্মদ রাসেলকে অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে। অথচ স্থানীয়দের দাবি, ওই হত্যা মামলার ভিকটিম ছিলেন মোহাম্মদ কাশেম। তদন্ত প্রতিবেদনে কাশেম হত্যার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে মামলার তিন সাক্ষী নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য। তারা জানান, ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি সাক্ষীদের তালিকায় তাদের নাম কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।
২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, ওইদিন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের দাবি, কাশেম হত্যার দিন ২৩ এপ্রিল উত্তেজিত এলাকাবাসী ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছিলেন। এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না।
একই দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগমসহ আরও কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে ফেলতে ও প্রতিশোধ নিতে তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতার।
রাশেদা বেগম জানান, গত ৩১ আগস্ট রাতে মহেশখালী থানা পুলিশের একটি দল তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে, পুত্রবধূ ফাতেমা বেগম ও বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে। তখনই তারা জানতে পারেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পরে ১ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করা হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রাশেদা ও নাছিমাকে জামিন দেন। তবে দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা বেগমকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমার পুত্রবধূকে কারাগারে পাঠিয়ে আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।’
ফাতেমার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাটির দেয়াল ও টিনের চালের তিন কক্ষের ছোট্ট একটি ঘর। এই ঘরেই তিন সন্তানকে নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেন তিনি।
ফাতেমার দুই মেয়ে রাজমিন আকতার চতুর্থ শ্রেণিতে এবং মিশকাত জান্নাত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের কারাবন্দিত্বের পর তারা কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় থাকছে। মাকে কাছে না পেয়ে কান্নাকাটি করছে শিশু দুটি।
ফলে ফাতেমা কারাগারে যাওয়ার পর একদিকে দেড় বছরের শিশুটি মায়ের সঙ্গে কারাগারে, অন্যদিকে দুই সন্তান আশ্রয় নিয়েছে এতিমখানায়। স্বামীকে হারানোর পর এবার সন্তানদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ফাতেমা।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি। কারও ঘরবাড়ি ভাঙচুরও করা হয়নি। কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা এখন কারাগারে। আর বাড়িতে ছোট ছোট দুটি শিশু মাকে ছাড়া রয়েছে।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল বলেন, ঘটনা জানার পর তিনি ইউপি সদস্যকে এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। তার কাছে জানতে পারেন, নিহত কাশেম ও অভিযুক্ত রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দলবদ্ধভাবে কবির বাজার থেকে দৌড়ানি দিয়ে ঘরের দরজার সামনে কাশেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য, কাশেম হত্যার পর তার পরিবার শোক পালন করছিল। এ সময় উত্তেজিত লোকজন তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসামিপক্ষ আদালতে মামলা করে। তিনি বলেন, মামলায় গত ১ সেপ্টেম্বর তিনজনকে পুলিশ ওয়ারেন্টমূলে গ্রেপ্তার করে। দুজন জামিন পেলেও কোলের সন্তানসহ একজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ফাতেমা বেগমের জামিনের জন্য তিনি বিনা ফিতে আদালতে যাবেন।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা প্রতুল সেন বলেন, থানার প্রতিটি মামলার তদন্ত তদারকির দায়িত্ব তার। এই মামলার বিস্তারিত তার মনে নেই। তিনি জেনে পরে জানাবেন। আর সব সাক্ষীর জবানবন্দি যদি একই হয়, আদালতের দৃষ্টিগোচর হলে আদালত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুসহ ফাতেমা কারাগারে থাকার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। মামলা সংক্রান্ত বিষয় আদালতের এখতিয়ারাধীন। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে ফাতেমার প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দিতে জেলা লিগ্যাল এইডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকেও বিষয়টি দেখভাল করতে অনুরোধ করা হবে।
ডিসি আরও বলেন, এতিমখানায় থাকা ফাতেমার অপর দুই সন্তানের প্রয়োজনীয় দেখভাল করতে মহেশখালীর ইউএনওকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে যে নারী মামলা করেছিলেন, আজ সেই নারীই আরেক মামলায় কারাগারে। কোলের শিশুটি মায়ের সঙ্গে বন্দিজীবনে, আর মায়ের অপেক্ষায় চোখের পানি ফেলছে অপর দুই সন্তান। ফাতেমার পরিবারের প্রশ্ন— যে ঘটনার সাক্ষী হওয়ার কথা, সেই সাক্ষীরাই যখন বলছেন ‘ঘটনাই ঘটেনি’, তখন কোন সত্যের ভিত্তিতে একজন মা ও তার শিশুকে কারাগারে থাকতে হচ্ছে?














