২৭ অক্টোবর ২০২৬

এতো বিদেশি একসাথে; আতঙ্ক নয়, দরকার সমন্বিত তদন্ত!

মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে দুটি অভিযান। স্থান আলাদা, ভবন আলাদা; কিন্তু দৃশ্যপট যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। বন্ধ দরজার ভেতরে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক, সারি সারি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের নানা আলামত! সব মিলিয়ে সামনে এসেছে উদ্বেগজনক কিছু প্রশ্ন।

৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয় চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে আটক করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৩০ থেকে ৪০টির মতো ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম। পুলিশ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।

এর ঠিক সাত দিন পর, ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী জালালাবাদ এলাকায় একটি আটতলা ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আটক করার খবর এসেছে। তাদের মধ্যে চীন, পাকিস্তান, লাওস ও ভিয়েতনামের নাগরিক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

দুটি ঘটনার প্রকৃতি ও অভিযোগ একেবারে অভিন্ন! এ কথা বলার সময় এখনও আসেনি। তদন্ত শেষ হয়নি। কিন্তু ঘটনাগুলোর মধ্যে যে কিছু দৃশ্যমান মিল রয়েছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। একদিকে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ প্রযুক্তি সরঞ্জাম; কোথাও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ, কোথাও অনলাইন জুয়া বা সন্দেহজনক আর্থিক কর্মকাণ্ডের আলামত! সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠবেই, এসব কর্মকাণ্ড কতদিন ধরে চলছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে তা আগে কেন আসেনি?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই! একটি ভবনে কয়েক ডজন বিদেশি নাগরিক দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে সেটি কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা নয়?

বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ, ভিসার ধরন, অবস্থানের ঠিকানা, কর্মসংস্থান বা ব্যবসায়িক পরিচয়, এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে থাকার কথা। তারা কোথায় থাকছেন, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, কে তাদের স্থানীয়ভাবে সহায়তা করছে, এসব যাচাইয়ের ব্যবস্থাও থাকার কথা।

তাহলে যদি সত্যিই কোনো চক্র বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সাইবার প্রতারণা, অনলাইন জুয়া, অবৈধ অর্থ লেনদেন কিংবা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে, সেটি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে শেষ করার বিষয় নয়। এর পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, স্থানীয় সহযোগী, ভিসা ও আবাসনের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

কক্সবাজারের ঘটনাটিও একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হোটেলের কক্ষে প্রায় দুই হাজার আইফোন ও কয়েক ডজন ল্যাপটপ, এত বিপুল সরঞ্জাম সেখানে কী উদ্দেশ্যে জমা করা হয়েছিল, তার উত্তর শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করলেই পাওয়া যাবে না। বরং এসব ডিভাইস কোথা থেকে এসেছে, কার অর্থে কেনা হয়েছে, কোথায় ব্যবহারের কথা ছিল এবং এগুলোর মাধ্যমে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছিল, তা বের করা জরুরি।

আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। কক্সবাজারের ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছিল, মামলায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি যদি সত্যিই একটি বড় নেটওয়ার্কের অংশ হয়, তাহলে একটি হোটেল বা ছয়জন ব্যক্তিকে ঘিরে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত চিত্র হয়তো সামনে আসবে না।

চট্টগ্রামের ঘটনাতেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক একটি ভবনে অবস্থান করছিলেন, তাদের প্রত্যেকের পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা, বাংলাদেশে প্রবেশের উদ্দেশ্য, স্থানীয় যোগাযোগ এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে ভবনটির মালিক, ভাড়াটিয়া বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কারা যুক্ত, তাদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা উচিত।

এখানে কোনো দেশের নাগরিককে আলাদাভাবে সন্দেহের চোখে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধের সঙ্গে জাতীয়তার সম্পর্ক নয়; সম্পর্ক অপরাধের সঙ্গে। তাই তদন্ত হতে হবে তথ্য, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। নির্দোষ বিদেশি নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, আবার অপরাধী কেউ যেন বিদেশি পরিচয়ের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ও না পান, দুটিই নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাজ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যদি সত্যিই একই ধরনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়, তাহলে এসব সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

কারণ প্রশ্নটা শুধু, কতজন বিদেশি আটক হলো? তা নয়!

প্রশ্ন হলো, তারা এখানে এলেন কীভাবে? কারা তাদের আমন্ত্রণ জানাল? কোন ভিসায় এলেন? কোথায় থাকছেন, তা কারা জানত? বিপুলসংখ্যক ল্যাপটপ ও মোবাইল দেশে ঢুকল কীভাবে?

কোন অর্থে এসব সরঞ্জাম কেনা হলো?
লেনদেনের অর্থ কোথা থেকে এলো এবং কোথায় গেল? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত কি না?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু অভিযান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কেবল দৃশ্যমান ব্যক্তিদের আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অপরাধের পুরো কাঠামোটি উন্মোচিত করবে।

সাত দিনের ব্যবধানে ঘটনা দুটি হয়তো বিচ্ছিন্নও হতে পারে। আবার একই আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কের ভিন্ন শাখাও হতে পারে। উত্তরটি তদন্তেই মিলবে। তাই এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, গভীর ও সমন্বিত তদন্ত। কারণ একটি ভবনের দরজা খুলে কয়েক ডজন বিদেশি নাগরিককে পাওয়া গেছে, এটি শুধু একটি অভিযানের খবর নয়। এটি আমাদের নজরদারি, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, আর্থিক গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

আজ প্রশ্ন উঠেছে, এত মানুষ, এত সরঞ্জাম, কার চোখ এড়িয়ে এক ছাদের নিচে জড়ো হলো? আগামী দিনের তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে, এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর খুঁজে বের করা।

লেখক: সম্পাদক, বাংলাধারা।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ