‘সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু নয়, বিষয় একটিই— আপনি বাংলাদেশি।’ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে শারদীয় দুর্গাপূজার নবমীতে চট্টগ্রাম নগরের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, এই দেশের আইন আপনার জন্যও প্রযোজ্য। এই দেশের ওপর আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপর আমারও সেই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে, এই রাষ্ট্র আমাকেও তাই দেবে।’
তিনি বলেন, এই দেশ সবার। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান— যে ধর্মের মানুষই হোন না কেন, প্রত্যেকের পরিচয় বাংলাদেশি নাগরিক। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয় হলেও দেশের নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার সমান। কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান, তা বিবেচনা করেনি। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে একসঙ্গে রাজপথে নেমেছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেসময় দেশের বিভিন্ন জেলার লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। কেউ গুলিবিদ্ধ হলে কিংবা আহত হলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে কেউ ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাননি। চিকিৎসকেরাও ধর্মের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেননি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার। এই দেশ আমাদের সকলের।’ ১৯৭১ সাল থেকে দেশের মানুষের লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে এবং মিলেমিশে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের লক্ষ্যও ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়তে হবে। এ জন্য সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু পরিচয় দিয়ে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা পরিহার করা উচিত। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি নিজেও সংখ্যালঘু ছিলেন। তাই সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিক পরিচয় ও সমান অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, জে এম সেন হলে দুর্গাপূজার আয়োজনে এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর আগমনকে তিনি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, ৫ আগস্টের পর তাঁরা আতঙ্কিত ছিলেন। তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা পাশে থাকায় চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষ অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে বসবাস করতে চান বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরেও চন্দ্রনাথ ধাম জাতীয়করণ করা হয়নি। দুর্গাপূজার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত মেধস আশ্রমের অবস্থাও বেহাল। তিনি হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টকে ফাউন্ডেশনে রূপান্তরের দাবি জানান এবং দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের সেবক কলোনি ও হাজারী গলির কয়েকজন বাসিন্দা মিথ্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন দাবি করে তাঁদের বিষয়ে সুবিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার।
এ সময় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জে এম সেন হলে গত ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগর শাখা দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে।














