২৬ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামে ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণ কৌশল ও রোডম্যাপ নিয়ে কর্মশালা

অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরের জন্য সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।

রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের দ্য পেনিনসুলা হোটেলের ডালিয়া হলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণ কৌশল ও রোডম্যাপ’ শীর্ষক বিভাগীয় পরামর্শ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কর্মশালায় ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের গুরুত্ব, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, ব্যবসা পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।

পরিবর্তন গ্রহণে মানসিকতা জরুরি
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সবার আগে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর বাস্তবায়িত হয় না। এ জন্য চাহিদা ও জোগানের বিষয়গুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করা সম্ভব হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ব দ্রুত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ব্যবসা পরিচালনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। তাই ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির কার্যকর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হবে।

পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিকীকরণের তাগিদ
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ শামছুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। দেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এ খাতের আওতায় থাকায় সব খাতকে একসঙ্গে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এ জন্য পর্যায়ক্রমিক উদ্যোগ, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

তিনি জানান, ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে আইএলও একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এর ভিত্তিতে দেশের আটটি বিভাগে বিভাগীয় পর্যায়ে পরামর্শ কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের কর্মশালার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের সূচনা হয়েছে।

উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ার আহ্বান
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিল্প পুলিশ-৩, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম শিল্প পুলিশের প্রতিষ্ঠা, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিল্প খাতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল ও নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে শিল্প পুলিশ কাজ করছে।

স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তার বলেন, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রক্রিয়াকে কেবল ব্যয় হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে স্থানীয় সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি সরকারি ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

সমন্বয় ও সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএলও বাংলাদেশের পরামর্শক আলী সাবেত। তিনি ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা, এ-সংক্রান্ত কৌশল ও রোডম্যাপ এবং বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ও সঞ্চালনা করেন আইএলও বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট অফিসার রুমান ইশতিয়াক বাতিন।

কর্মশালায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিএসটিআই, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি, ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিভাগীয় শ্রম দপ্তর, শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়তন এবং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ও সুপারিশ উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, কার্যকর নীতিমালার বাস্তবায়ন এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ