জাল বিল, ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স, পরিচয়সংক্রান্ত জাল নথি এবং ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংঘবদ্ধ চক্রটি একে অপরের সাথে যোগসাজশে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের চট্টগ্রাম-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বাদী হয়ে সোমবার (২৬ অক্টোবর) মামলাটি করেন। এতে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা
দুদকের এজাহারে অভিযুক্ত ১৪ জন হলেন: মোহাম্মদ হাবিবুল্লা খান, পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, খোকন চন্দ্র দে, মো. মামুন হোসেন, সৈয়দ মো. সাইফুর রহমান, মো. আবু নাছের, মো. মাকসুদুর রহমান, মুহাম্মদ ইকবাল, এম. মনজুর উদ্দিন চৌধুরী, মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, মো. পারভেজ, বিদেশ বড়ুয়া এবং গোলাম মোহাম্মদ ফয়সাল সরওয়ার।
এজাহারে তাঁদের বিভিন্ন সময়ের পদ-পদবি ও সংশ্লিষ্টতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের হিসাব, অডিট, স্টোর ও বাজেট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে
দুদকের এজাহারে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির নাম এসেছে। এ ছাড়া ‘দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামের বানান ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য মূল নথির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে আত্মসাত হয়
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন বিল প্রস্তুত, যাচাই, অনুমোদন ও পরিশোধের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স এবং ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ পরিচয়সংক্রান্ত নথি ব্যবহার করে ‘দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় তৈরি করা হয়। ওই পরিচয় ব্যবহার করে সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির একটি শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা এবং রেলওয়ের বিলের অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়, পেশা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে দাখিল করা নথির অসংগতি ছিল। ট্রেড লাইসেন্সের আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যেও গরমিল পাওয়া যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রেলওয়ের বিভিন্ন বিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই, অনুমোদন, অডিট নম্বর, স্বাক্ষর ও এনক্যাশমেন্ট সিলসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি বিলের ভ্যাট কর্তনের হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে বলে দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে পেমেন্ট বুক, সি-৩ রেজিস্টার, বিল রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে বিল প্রস্তুত ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে দুদক। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইডি ব্যবহার করে বিল প্রস্তুত এবং পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের অভিযোগও রয়েছে।
ব্যাংক হিসাব ও অর্থ স্থানান্তরেও অনিয়মের অভিযোগ
এজাহারে বলা হয়েছে, জাল পরিচয় ও নথি ব্যবহার করে খোলা ব্যাংক হিসাবে রেলওয়ের বিলের অর্থ জমা হয়। পরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির আমবাগান শাখা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্য তদন্তে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পরের সহযোগিতায় অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাল নথি ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মামলা করা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে আরও বলা হয়েছে, অনুসন্ধানকালে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও ভূমিকা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে নতুন তথ্য বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে যাচাই করা হবে।














