চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, সড়কের বেহাল দশা ও নাগরিক সেবার নানা সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দায়িত্ব শুরু করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-নালা পরিষ্কার, খেলার মাঠ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় চসিকের অধীনে ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন তিনি। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অধ্যায়।
২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুই তারিখই অন্তর্ভুক্ত করে হিসাব করলে তাঁর দায়িত্বকাল ৭২০ দিন। এ সময়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জন নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে আগ্রহ।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-নালা পরিষ্কার
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জলাবদ্ধতা নিরসনকে অগ্রাধিকার দেন ডা. শাহাদাত হোসেন। বর্ষা মৌসুমে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে খাল, নালা ও নর্দমা পরিষ্কারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে চসিকের বাজেট ঘোষণাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, নগরীর ১৯টি খাল থেকে ৪১ লাখ ঘনফুট মাটি ও আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে। এ কাজে ব্যয় হয় ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। একই সময়ে নালা ও নর্দমা পরিষ্কারে ১৪৮টি প্রকল্পের জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মেয়র দাবি করেন, জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক কার্যক্রমের প্রয়োজন রয়েছে।
৪১ ওয়ার্ডে খেলার মাঠ উন্নয়নের উদ্যোগ
নগরীর শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে ৪১টি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন মেয়র। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ১১টি ওয়ার্ডে মাঠ উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা ছিল।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্টে পাঁচলাইশে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উদ্বোধন করা হয়। মাঠটি সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় স্কুল হেলথ স্কিম
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্কুল হেলথ স্কিম চালুর উদ্যোগও মেয়র তাঁর মেয়াদকালের উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে তুলে ধরেন। স্কুল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থ বিকাশে এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ উদ্যোগের আওতায় কতজন শিক্ষার্থী সেবা পেয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে এর বাস্তব অগ্রগতি আরও স্পষ্ট হবে।
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় চসিকের অধীনে ফেরানোর উদ্যোগ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও মেয়র তাঁর মেয়াদকালের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি চসিকের অধীনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সর্বশেষ প্রশাসনিক ও আইনি অবস্থার নথি যাচাই করে চূড়ান্ত অগ্রগতির পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার বাজেট
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করে চসিক। ২০২৫ সালের ২৩ জুন ঘোষিত এ বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়, যা আগের অর্থবছরের ৩৩ কোটি টাকার তুলনায় বেশি।
বাজেটে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারসহ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, ঋণ পরিশোধে ১৪৯ কোটি টাকা এবং মশক নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়। এসব বরাদ্দের মাধ্যমে নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে হোল্ডিং ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা আনার বিষয়টি এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।
খাল পুনরুদ্ধার ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন
নগরীর দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সমস্যা মোকাবিলায় খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি খুলশী লেক সিটি এলাকায় কালিছড়া খাল খনন কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন মেয়র।
খাল পুনরুদ্ধার, পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বর্ষার আগে নিয়মিত পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে নগরীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
অর্জনের পাশাপাশি অসমাপ্ত কাজের হিসাব
ডা. শাহাদাত হোসেনের মেয়াদকালে জলাবদ্ধতা মোকাবিলা, খাল-নালা পরিষ্কার, খেলার মাঠ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে কিছু কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি এসেছে, আবার কিছু পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও সুফল মূল্যায়নের জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন।
চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও নাগরিকবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে এসব উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর স্থায়ী সুফল নির্ভর করবে ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর।
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ থেকে প্রশাসক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া পর্যন্ত ৭২০ দিনের এই সময়কে তাই শুধু ঘোষিত পরিকল্পনা দিয়ে নয়, বাস্তবে সম্পন্ন কাজ এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রায় তার প্রভাব দিয়েই মূল্যায়ন করতে হবে।














