৪ নভেম্বর ২০২৬

৫৮ কোটি টাকা আদায়

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আমদানির আড়ালে শুল্ক ফাঁকি, তিন মাসে ৪৬৭ চালান জব্দ

চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কখনো স্ক্র্যাপের নামে যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি, কখনো মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী, আবার কখনো অন্য পণ্যের আড়ালে আমদানি করা হচ্ছে মোবাইল ফোন। আমদানি নথিতে পণ্যের বিবরণ এক থাকলেও বাস্তবে কনটেইনার খুলে মিলছে ভিন্ন পণ্য। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারকরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মিথ্যা ঘোষণা সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭০টি। রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চালান জব্দ ও মামলা, দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে।

মিথ্যা ঘোষণার অভিনব কৌশল
শুল্ক ফাঁকির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের একটি অংশ এখন নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। কখনো পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছে, আবার কখনো কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নজরে আসা অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, স্ক্র্যাপ ঘোষণায় যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, মডেলিং ক্লে ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী আনা এবং অন্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন আমদানি। এ ধরনের চালান শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পণ্য জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পণ্যের সঠিক বিবরণ, মূল্য ও পরিমাণ গোপন করে শুল্ক কম দেওয়ার চেষ্টা শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়; এটি দেশের আমদানি ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

তিন মাসে ৪৬৭ চালান, ২৭০ মামলা
প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জব্দ করা চালানের সংখ্যা ৪৬৭টি। এসব ঘটনায় ২৭০টি মামলা হয়েছে। রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা।

বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে এক মাসেই ১৬৮টি চালান জব্দের তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় নয়, নিয়মিত আমদানি কার্যক্রমের মধ্যেও মিথ্যা ঘোষণা ও পণ্যের বিবরণে অসংগতির ঘটনা শনাক্ত হচ্ছে।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৬৭টি চালান জব্দ এবং ২২৮টি মামলা হয়েছিল। সে সময় রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ের পরিসংখ্যানেও মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি ও শুল্ক অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।

রানা ফার্মের চালান খালাসে শুল্কায়ন নিয়ে প্রশ্ন!
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের কালাপাগলা এলাকার রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেড চালানটির আমদানিকারক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার ৬০১, শেখ মুজিব রোডের চতুর্থ তলায় অবস্থিত ‘ডায়নামিক ফ্রেইড সিস্টেম’ নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট গত ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। বিল অব এন্ট্রির নম্বর সি-১২২৫৮১৬।

অভিযোগ রয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির আওতায় রেয়াতি সুবিধা নিয়ে চালানটি খালাস করা হয়েছে। এতে প্রাপ্য শুল্ক-কর আদায়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত
মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থায়। প্রকৃত পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্য ঘোষণা করা হলে সরকার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে যারা নিয়ম মেনে যথাযথ শুল্ক পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পণ্য কম দামে ঘোষণা, পণ্যের পরিমাণ গোপন কিংবা অন্য পণ্যের আড়ালে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির কারণে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সামগ্রিক আমদানি ব্যবস্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণত ভুল ট্যারিফ ক্লাসিফিকেশন, পণ্যের পরিমাণ বা দাম কম দেখানো এবং কম শুল্কের পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য আনার মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের সন্দেহজনক অনিয়মের ঘটনা শনাক্ত করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণার পেছনে কখনো কখনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তবে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে যেন বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকার কথা বলেন তিনি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি ঠেকাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও বাড়ানো হচ্ছে।

নজরদারির পরও কেন বাড়ছে অনিয়ম
চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলেও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। পণ্য খালাসের আগে ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্তকরণ, আমদানি নথি যাচাই, পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ এবং কনটেইনার পরীক্ষার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে?

বিশেষ করে একই ধরনের পণ্য বা একই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে বারবার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আমদানি কার্যক্রম বিশেষ নজরদারিতে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখাও জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি দেশের বৈধ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

তাই শুধু চালান জব্দ ও মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। মিথ্যা ঘোষণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভূমিকা শনাক্ত, অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধ এবং রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন