২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্বপ্নের কক্সবাজার রেল লাইন প্রকল্প (পর্ব-৪)

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

সমুদ্র সিটি কক্সবাজারে আর মাত্র তিন বছর পর সারা বছরই টইটুম্বুর থাকবে পর্যটকে। সারা বছরই থাকবে বিদেশী পর্যটক। কারণ এখন সড়ক পথে আরামদায়ক ভ্রমণ উপভোগ করতে পারছেনা অনেকেই, বিশেষ করে বিদেশী পর্যটকরা। হোটেল-মোটেল রেস্তোরা বছরের ছয়টি মাসকে মৌসুম ধরে একচেটিয়া ব্যবসা চালায়। আগামী তিন বছর পর সারা বছরই ব্যবসা করতে পারবে ব্যবসায়ীরা। ট্রেন চলাচল শুরু হলে শতভাগ পর্যটক আগ্রহী হবে সমুদ্র সিটি কক্সবাজারে অবস্থানের পরিকল্পনায়। এমন তথ্য ব্যক্ত করছেন স্থানীয় আবাসন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, ঢাকা ও সিলেট থেকে বিভিন্ন ট্রেনে সাব লাইনে চট্টগ্রাম পৌঁছাবে পর্যটকরা। চট্টগ্রাম জংশন স্টেশন থেকেই সমুদ্র সিটি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে সকাল বিকাল দু’দফায় ছেড়ে যাবে ট্যুরিষ্ট ট্রেন। তবে ২০২০ সালে করোনাকালীন দুই মাস কাজ বন্ধ রাখাসহ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান।  

প্রথমে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল ট্র্যাক স্থাপনের সিদ্ধান্ত থাকলেও পরবর্তীতে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় ট্রেনের স্টপেজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে বান্দরবানের গুনদুম তথা মিয়ানমারের সীমান্ত পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় মোট ১৮ হাজার ৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কক্সবাজারে রেললাইন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত। আবার রামু হতে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফ থেকে।

২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে বলেছেন, ভূমি অধিগ্রহণের সময় ভবিষ্যতে ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান রেখে ভূমি অধিগ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করেন। সে অনুযায়ী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এডিবি কর্তৃক ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্প প্রাক্কলন নির্ধারণ করা হয়। তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান যা করতে পারেনি তা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ তা করে দেখাচ্ছে। যদিও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের(টিএআর) জন্য প্রথম সার্ভে ১৮৯০ সালে। তবে দ্বিতীয় সার্ভে করা হয়েছিল ১৯২০ সালে।

১৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত শতভাগ সম্পন্ন হবে এমন ধারনা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে ২০২৪ পর্যন্ত। প্রকল্প পরিচালকের দফতর সূত্রে জানা গেছে,মিয়ানমার রেলওয়ে ১৮৯০ সালে প্রথম ফিজিক্যাল সার্ভে করা হয়। ১৯০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ সার্ভে  করে মিয়ানমার রেলওয়ে।

পরবর্তীতে চট্টগ্রামের সাথে আকিয়াবের (মায়ানমার) রেল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দোহাজারী হতে রামু হয়ে মিয়ানমারের আকিয়াব পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের সার্ভে শেষ করা হয় ১৯১৯ সালে। মিয়ানমার পর্যন্ত রেল লাইন চালু করতেই চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত মিটার গেজ রেল লাইন  আগেভাগেই স্থাপন করা হয়। তবে ১৯৫৮ সালে পূর্ব বাংলা রেলওয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিন দিক থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের জন্য সার্ভে করে। এই সার্ভের মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলওয়ে সংযোগ স্থাপন করা। কিন্তু পদক্ষেপের অভাবে পর্যটন শিল্পের এই ধাপটির বাস্তবায়ন হয়নি। 

এদিকে, জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) কর্তৃক ১৯৭১ সালে রেলওয়ে লাইনটির ট্রাফিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সম্ভাব্য সমীক্ষা পরিচালনা করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জাপানের জেআরটিএস ১৯৭৬-১৯৭৭ সালে ডাটা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে ইকোনমিক এন্ড স্যোসাল কমিশন ফর এমিয়া এন্ড দ্যা প্যাসিফিক (ইএসসিএপি) কমিশন অধিবেশনে সম্মতি প্রাপ্ত “এশিয়ান ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার ডেভেলপমেন্ট (আলটিড)” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত সমীক্ষায় ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) নেটওয়ার্কের তিনটি ইউরোপ-এশিয়া সংযোগ রোডের মধ্যে সাউদার্ন কোরিডোর অন্যতম রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৯৫ সালে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের জন্য সাউদার্ন কোরিডোর-১ এর উপর প্রাথমিক স্টাডি পরিচালনা করা হয়। কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান বাংলাধারা প্রতিবেদককে বলেন, ২০২২ সালের জুনের মধ্যে মূল কাজ শেষ করা যেত কিন্তু ট্রায়ালসহ বিভিন্ন সক্ষমতা দেখতে সময়ের প্রয়োজন। তাই ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ন বৃদ্ধির অনুমতি চেয়ে মন্ত্রনালয়ে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। আর শতভাগ কাজ সম্পন্ন করেই ট্রেন চলাচল শুরু হবে। দ্রুত গতিতে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায়।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন