২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস

অপ্রাপ্তিতে এগুচ্ছে না কক্সবাজারের পর্যটন!

আজ (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস। সারা বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে কক্সবাজারেও পালিত হবে দিবসটি। দিবস উপলক্ষ্যে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট হতে একটি র‌্যালি প্রধান সড়ক হয়ে লাবনী উন্মুক্ত মঞ্চে এসে শেষ হয়ে চলবে আলোচনা সভা। র‍্যালিটি বর্ণাঢ্য ও প্রাণবন্ত আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সমন্বয়ক ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারিদের মতে, পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ ১২০ কিলোমিটার অখন্ড সৈকতকে ঘিরে আশিরদশক থেকে কক্সবাজারের পর্যটনের সূচনা। শুরুতে হাতেগোনা কয়েকটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও ৯০ দশক থেকে ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে পর্যটন বিনিয়োগ। কলাতলীকে হোটেল-মোটেল জোন ঘোষণার পর গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০০ আবাসিক প্রতিষ্ঠান। হাজার-লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ হলেও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে সবকিছুই এখনো অপরিকল্পিত।

তাদের মতে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নেই। স্ট্রীট ফুডের ব্যবস্থা নেই। সাগর তীরে হাটা, গোসল করা ছাড়া রাতের বিনোদনে কিছুই নেই। নেই কোন থিয়েটার হল, নাইট বাজার, নাইট লাইফের ব্যবস্থা। এমনকি রাতের সমুদ্র সৈকতে পর্যাপ্ত আলোও নেই। নেই প্রশিক্ষিত ডুবুরি দলও। বিচের কিনারে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই, নেই ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার। চারদিকে শুধু নেই আর নেই। তবে, বিশ্ব পর্যটন দিবস আসলে গত একদশক ধরে তিনদিন, সপ্তাহ বা পক্ষকাল পর্যটন মেলার আয়োজন করা হয়।

পর্যটন সেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, এসবে পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজারের কোন স্থায়ী উন্নয়ন না হলেও পদে পদে হয়রানিতে পড়েন পর্যটকরা। এত শূণ্যতা আর হয়রানির কবলে বরং দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প। ইতিমধ্যেই কক্সবাজার বিমুখ হয়েছে বিদেশী পর্যটক। দেশীয় পর্যটকরাও একবার ফিরে গেলে পারতপক্ষে দ্বিতীয়বার আর কক্সবাজার আসতে চান না। এরপরও যারা সাগর ও পাহাড়ের সান্নিধ্য ভালোবাসেন সেসব দর্শণার্থী কক্সবাজার এসে ঘুরে যান।

জেলা প্রশাসন পর্যটন করপোর্শেন ও সংশ্লিষ্ঠদের তথ্য মতে, জেলায় পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝর্ণা, পাথুরে সৈকত, পাথুরে পাহাড়, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধ বিহার, রাবার বাগান, চা বাগান, গর্জন বিহার, টেকনাফের মাথিনের কূপ ও সেন্টমার্টন, কুতুবদিয়ার বাতিঘর ছাড়াও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এইসব দেখতে প্রতিবছর লাখো দেশীয় দর্শনার্থী কক্সবাজার এলেও পর্যাপ্ত বিনোদন ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশী পর্যটকরা দিন দিন কক্সবাজার বিমুখ হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হোটেল মালিক বলেন, সমুদ্রটা ছাড়া কক্সবাজারে পর্যটকদের রাতের বিনোদনের কোন ব্যবস্থা নাই। তার উপর কোন কর্পোরেট কোম্পানি হোটেলের ইনডোরে বাৎসরিক প্রোগ্রাম করতে চাইলে অনুমতি নামে হয়রানিতে পড়তে হয়। প্রশাসনিক এলাকায় কি হচ্ছে নিয়মমতে, তা জেলা প্রশাসনকে লিখিত জানানোর পর মাথাপিছু ৮০-১০০ টাকা না দিলে সেই প্রোগ্রামের অনুমতি মিলে না। লিখিত অনুমতি না নিয়ে অনুষ্ঠান করা হলে, মাঝপথে নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। আগে জেলা প্রশাসন এটি করলেও এখন পৌরসভাও একইভাবে হয়রানি করছে। তারাও মাথাপিছু টাকা না পেলে টিম পাঠায় হোটেলে। এটা শুধু একটি হোটেলের চিত্র নয়, হলরুম থাকা সকল তারকা-নন তারকা হোটেলকে একই সমস্যার মুখোমুখী হতে হচ্ছে। অথচ আভ্যন্তরিণ প্রোগ্রাম করার জন্যই তারকা হোটেলগুলো বাৎসরিক লাখ লাখ টাকা লাইসেন্স নবায়ন ফি দেয়।

তিনি আরো জানান, এখানে এক সংস্থার নেয়া উদ্যোগ অন্য সংস্থা বন্ধ করে দেয়। অনুমতির ফাঁদের হয়রানির কবলে পড়ে গত বছর চারেক সময়ে কক্সবাজারে কর্পোরেট প্রোগ্রামগুলো কমেছে ৯০ শতাংশ। এখন কর্পোরেট হাউসগুলো গাজীপুর বা অন্য স্থানে তাদের অনুষ্ঠান করছে। যা কক্সবাজারের রাজস্বের জন্য চরম ক্ষতি।

কক্সবাজারের ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি বিভাগে পাঠদান করা অধ্যাপক মঈনুল হাসান পলাশ বলেন, পর্যটন বিকাশের অন্যতম শর্ত হলো নিরাপত্তা, স্থানীয়দের অংশগ্রহন, স্ট্রীট ফুড় ও নাইট লাইফ। কিন্তু এর কোনটিই কক্সবাজরে নাই। বেসরকারীভাবে কেউ পর্যটন বিকাশে কিছু করতে চাইলে সেক্ষেত্রে আইনের ফাঁক ফোকরে তা বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ঠরা। এমনও শুনি-কেউ হোটেলের বলরুমে, রুফটপে কিংবা সীমানার ভেতর খালি জায়গায় পর্যটন বিনোদনে গান বা শালীন অন্যকোন প্রয়োজন করতে চাইলে বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অুমোদন নিতে হয়। এখন পৌরসভাও এসব অনুমোদনে ভাগীদার হচ্ছে। আবেদন দিয়ে অনুমোদন পেতে চাহিদামতো মোটা অংকের টাকাগুনতে হয় বলে অভিযোগ উঠে। টাকা আদায় ছাড়া, পর্যটক টানতে প্রশাসনিক ভাবে কোন কার্যক্রম কিন্তু চোখে পড়ে না। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটন এগুনোর চেয়ে পেছায় বেশি।

ট্যুর অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, স্ট্রীট ফুড ছাড়া পর্যটন চলেনা। স্ট্রীট ফুড না থাকলেও আনহ্ইাজেনিক ফুডস বিক্রি হচ্ছে এখানে। যা ভ্রাম্যমান আদালত অভিযানে জরিমানা করে, মাঝে মাঝে বন্ধও করে দেয়। তবে, উচিত ছিল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসম্মত স্ট্রীট ফুড তৈরী ও পরিবেশনে দক্ষতা বাড়ানো। এছাড়া আমাদের পর্যটনে স্থানীয়দের অংশগ্রহন নেই বললেই চলে। কাজের অভাবে অনেকে পর্যটন জোনে ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কাজ করছে। কর্পোরেশনের দায়িত্ব হরো স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে পর্যটনে কাজে লাগানো- এ শহরে তা হয় না।

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, সমুদ্র নগরী কক্সবাজারে প্রাকৃতিকভাবে থাকা দর্শনীয় স্থানগুলো ছাড়া আর কিছু নেই। আমরা লবিতে সান্ধ্যকালীন লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা করে পর্যটকদের বিনোদনের ব্যবস্থা করি। এটা ছাড়া বলা যায়, সন্ধ্যা হলেই ঘুমিয়ে পড়ে পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজার। এই কারণে পর্যটন শিল্পে জিপিডি মাত্র ৪শতাংশ। এ থেকে উত্তোরণে পযর্টনশিল্পকে সামনে নেয়ার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেক্টরে সমন্বয়হীনতা ও হয়রানি রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা রেস্তোরা মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, সৈকতের লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমটিার এলাকায় সবচেয়ে লোক সমাগম ঘটে। কিন্তু এখানে কোন পর্যটক হঠাৎ অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। দুগ্ধপোষ্য শিশু নিয়ে অনেক মা বেলাভূমিতে আসেন। তাদের জন্য নেই ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার। অত্যাধুনিক কোন শপিং মল নেই, থিয়েটার বা সিনেমা হল নেই। ডিসকো বার, ক্যাসিনো, দেশি-বিদেশী সার্কাস প্রদর্শনী ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনের তুলনায় বারও অপ্রতুল। একটি সংস্থা ব্রেস্ট ফিডিং কেন্দ্র চালু করে, আরেক সংস্থা তা বন্ধ করে দেয়। এত সমন্বয়হীনতায় কয়েকদিনের মেলায় পর্যটন আগায় না।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, বিদেশী পর্যটক টানতে অবশ্যই নাইট লাইফের ব্যবস্থা রাখা দরকার। অথচ বছরের পর বছর একটি নাইট বাজারই বসানো সম্ভব হয়নি। বিশ্ব পর্যটন করতে কি কি লাগবে সেগুলো সংশ্লিষ্টদের ভাবনাতে আছে কিনা জানা নেই। পর্যটন কর্পোরেশন নিজেই বছরের পর বছর লস গুনছে। অথচ কর্পোরেশনের কাজ ব্যবসা করা নয়। বেসরকারী উদ্যোগকে সহযোগীতা করা। বিভিন্ন আইডিয়া উদ্যোক্তার মধ্যে ছড়িয়ে তাদের মাধ্যমে পর্যটনকে এগিয়ে নেয়া।

স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ জানে আলম জানান, একসময় হোটেল শৈবালের সামনে শাপলা ফুলের লেক ছিল, গলফ মাঠ ছিল যা পর্যটকদের মুগ্ধ করতো। তখন বিদেশী অনেক পর্যটক কক্সবাজারে আসতো। কিন্তু সেই লেক এখন নর্দমা হিসেবে ও গলফ মাঠ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ভাড়া দেয়া হয়েছে।

পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শৈবালের লেক ও গলফ মাঠ কক্সবাজারের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ছিল। কিন্তু এখন আর তা নেই। কক্সবাজারে আমাদের ৪টি হোটেল ও ৫টি কটেজ রয়েছে। এরমধ্যে ৫টি কটেজ ও মোটেল প্রবাল বিদেশী এনজিওকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এরপরও আমরা সরকারি নির্দেশনায় এগুনোর প্রক্রিয়াতে চলছি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, কক্সবাজারের পর্যটনকে বিশ্বময় করার প্রক্রিয়া নির্ধারণে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতে কি হয়েছে তা নিয়ে পড়ে না থেকে সামনে এগুতে সবার সমন্বিত পরামর্শ নিয়ে আমরা এগুবো। এভাবেই কক্সবাজার অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

কক্সবাজার উন্নয়ন পরিষদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ওয়াহিদ রুবেল বলেন, পর্যটন চাঙ্গা হলে দেশের অর্থনীতি বলিষ্ঠ হয়। প্রতিবছর এ খাত থেকেই দেশের মূল অর্থনীতিতে যোগান হয় হাজার কোটি টাকা। সেই টাকা ব্যবহার করেই দেশের অখন্ড ১২০ কিলোমিটার সৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়া যায়। এভাবে সকলের সমন্বয় ও আন্তরিকতায় কক্সবাজার দেশের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে পরিচিতি পাবে।

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনে ও বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির উদ্যোগে চলমান তিনদিনের পর্যটন মেলায় ৮০টির মত স্টল অংশ নিয়েছে। তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস, সায়মন, সী পার্ল, গ্রীণ ন্যাচার, সীগাল স্টল সাজিয়ে সমৃদ্ধ করেছে মেলা। স্বল্প ব্যয়ে তারকা হোটেলের খাবারের স্বাদ পাচ্ছেন আগত পর্যটক ও দর্শণার্থীরা। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র তুলে ধরা হয়েছে অন্য স্টল গুলোতে। নারী উদ্যোক্তাদের বাহারী পণ্য, আচার, শুঁটকি ও পিঠাসহ হরেক রকমের আয়োজন রয়েছে মেলায়। রবিবার পর্যন্ত সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এ আয়োজন উপভোগ করা যাবে বলে জানান জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইউনূস।

আরও পড়ুন