২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি খাতে কর ছাড় দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি করের চাপ পড়তে যাচ্ছে তামাকজাত পণ্যে। সিগারেটের সব স্তরের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর পাশাপাশি নিকোটিন পাউচ, হিটেড টোব্যাকো ও অন্যান্য নিকোটিনজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে সিগারেট ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বাড়বে। এছাড়া দেশে উৎপাদিত অ্যালকোহলের ওপর নতুন ভ্যাট আরোপ করায় এ খাতের পণ্যের মূল্যও বাড়তে পারে।
মধ্যম সারির পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির করহার বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, যা এসব গাড়ির বাজারমূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে আমদানিকৃত কাজুবাদাম, উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ, পাঙ্গাস ফিলেট, বিদেশি ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন, এমএস রড, কপার তার, কপার টিউব, জিপসাম বোর্ড, কোল্ড-রোল্ড শিটসহ বিভিন্ন শিল্প ও নির্মাণসামগ্রীর ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে খাদ্য ও ভোক্তা বাজারেও পড়তে পারে।
ফাস্টফুড ও রেস্তোরাঁ খাতেও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ খাবার মোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত গ্রিজ প্রুফ ও গ্লাসিন পেপারের শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কিছু স্বস্তির খবর রয়েছে। কৃষিপণ্য, গবাদিপশু, মাছ, ভোজ্যতেল, বীজ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ ও চিনির ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সব ধরনের মসলার ওপর রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং খেজুর আমদানিতে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব বাজারে এসব পণ্যের দাম কমাতে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, ব্লাড টিউবিং সেট, হার্টের স্টেন্ট এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট ও কর ছাড়ের প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালসহ ওষুধ শিল্পের বহু উপকরণ শুল্কমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিপণ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের স্বস্তি দেওয়া হয়েছে। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমতে পারে।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার কমানোর পাশাপাশি ইভি চার্জার, চার্জিং স্টেশন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানি করা ইলেকট্রিক বাসে কর-শুল্ক মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া নতুন মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার এবং ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাবও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে জনস্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতকে কিছুটা সুবিধা দেওয়া হলেও তামাক, গাড়ি, নির্মাণসামগ্রী ও বেশ কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যে করের চাপ বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরে বাজারে কোন পণ্যের দাম বাড়বে আর কোনটি কমবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এই কর ও শুল্ক প্রস্তাবগুলোর চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ওপর।














