২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘চলে আসুন ষোলশহর’ যে ফেসবুক পোস্ট চট্টগ্রামের আন্দোলনে নতুন গতি এনেছিল

মাত্র তিনটি শব্দ ‘চলে আসুন ষোলশহর’। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে ফেসবুকে দেওয়া এই সংক্ষিপ্ত আহ্বানই পরবর্তীতে চট্টগ্রামের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়।

পোস্টটি করেছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা মো. ওয়াসিম আকরাম। ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনে যোগ দেন। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুরাদপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠে।

সহযোদ্ধা, পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গতি পেতে শুরু করে। হামলা, বাধা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও প্রতিদিন নতুন নতুন শিক্ষার্থী আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছিলেন।

ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিকেল ৩টার দিকে ওয়াসিম আকরামের দেওয়া ‘চলে আসুন ষোলশহর’ পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেন।

সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্ট দেওয়ার পর ওয়াসিম নিজেও মিছিলে যোগ দেন। প্রথমে ষোলশহরে অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরিস্থিতির কারণে আন্দোলনকারীরা মুরাদপুরে চলে যান। সেখানে সংঘর্ষের একপর্যায়ে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া আরেকটি পোস্টে ওয়াসিম লিখেছিলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আমার প্রাণের সংগঠন, আমি এই পরিচয়ে শহীদ হব।’ পরে এই স্ট্যাটাসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, ১৬ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে প্রথমে ষোলশহর রেলস্টেশন এলাকায় জড়ো হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে সেখানে সশস্ত্র অবস্থান থাকায় আন্দোলনকারীরা মুরাদপুরে চলে যান। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সদস্যদের হামলার মুখে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এ সময় শিক্ষা বোর্ড এলাকায় ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন শাহেদ বলেন, সংঘর্ষের সময় তাঁরা শিক্ষা বোর্ড ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে বের হওয়ার সময় অন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে গিয়ে ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ওয়াসিম হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। একই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলারও সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

ওয়াসিমের মৃত্যুর পর চট্টগ্রামজুড়ে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন থেকেই নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। মুরাদপুর, ষোলশহর ও বহদ্দারহাট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পর্যবেক্ষকদের মতে, ওয়াসিমের মৃত্যু চট্টগ্রামের আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।

২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোছনা বেগম পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পৃথক মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা বাজারপাড়ার বাসিন্দা ওয়াসিম আকরাম পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তিনি শুধু আন্দোলনের কর্মীই নন, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও ছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেও ফল প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তাঁর ছেলেসহ অনেক তরুণের আত্মত্যাগ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। তিনি সন্তানের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

দুই বছর পরও ‘চলে আসুন ষোলশহর’ এই তিনটি শব্দ চট্টগ্রামের জুলাই আন্দোলনের সাহস, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

আরও পড়ুন