৯ অক্টোবর ২০২৬

জলাবদ্ধতা ঠেকাতে এবার সামষ্টিক সমাধানের পথে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা ও সামষ্টিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয়, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে খালের দুই পাড়ে হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের মাধ্যমে নগরকে আরও বাসযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে নগরের টাইগারপাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি এলাকায় প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই অন্য এলাকায় নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সামষ্টিক পরিকল্পনা নিতে হবে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত কাজগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি যেসব কাজ এখনো বাকি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ জন্য প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে অর্থের অপচয় কমবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানো সম্ভব হবে।

খাল ঘিরে নতুন নগর পরিকল্পনা
জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি খালকেন্দ্রিক উন্নয়নকে নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে বিবেচনার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, নগরের বড় খালগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি দুই পাড়ে হাঁটার উপযোগী পথ এবং যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানে সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশনের উন্নতির পাশাপাশি হাঁটাচলা, সাইকেল চালানো, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নগরের পরিবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে বৃক্ষরোপণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সবুজায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল উন্নয়ন, সবুজায়ন এবং হাঁটার পথ ও সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য নগরে পরিণত করতে হবে।

১৩০ খালের উন্নয়নে উদ্যোগ
সভায় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরের নালা ও খাল পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বর্ষার আগে নালা ও খালের উন্নয়ন এবং পরিষ্কার কার্যক্রমের জন্য ৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ায় তিনি অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

মেয়র বলেন, নগরে ১৩০টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি খালের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও ৪১টি খাল উন্নয়নের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অবশিষ্ট খালগুলোর উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। উন্নয়নকাজ শেষ হওয়া খালগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা সমন্বিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, নগরের ১৩০টি খালের মধ্যে ৩৭টি সংস্কার করা হয়েছে। পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অবশিষ্ট খালগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি নগরে স্থাপিত স্লুইসগেট ও রেগুলেটরগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আউটার রিং রোড প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ কালুরঘাট পর্যন্ত ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার আশা করা হচ্ছে।

সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার তাগিদ
সভায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার কয়েকটি স্থানে ভারী বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার পেছনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা ও পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও পানি সংরক্ষণের স্থানগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।

চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই চলমান প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম শামস বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের পথে। প্রকল্পটি শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমবে। তবে প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলোও খনন করতে হবে এবং সংস্কারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম নগরের পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়াতে অন্তত দুটি সংযোগকারী ‘ক্রস খাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। মহেশখাল সম্প্রসারণসহ এ ধরনের খাল নির্মাণ ও সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি নৌচলাচলের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া রোধে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আর্চ ব্রিজের নকশা বিবেচনারও পরামর্শ দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প ও স্লুইসগেট স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে মানুষ ও যানবাহনের আশ্রয়ের উপযোগী উঁচু জায়গার সংকট দেখা গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত এক কিলোমিটার রাস্তা তুলনামূলক উঁচু করে নির্মাণের প্রস্তাব দেন তিনি।

সভায় আরও বক্তব্য দেন সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মনোয়ারা বেগম, জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা।

আরও পড়ুন