২৪ অক্টোবর ২০২৬

ডিআইএ’র কালো তালিকায় উখিয়ার প্রধান শিক্ষক

জাল সনদে চাকরি, বছরের পর বছর বেতন নিলেন শিক্ষক

শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে কক্সবাজারের উখিয়ায়। উপজেলার থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে জাল কম্পিউটার সনদ ব্যবহার করে বছরের পর বছর শিক্ষকতা করার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) বিশেষ নিরীক্ষায় তার জমা দেওয়া সনদটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট বলে প্রমাণিত হয়েছে।

শুধু তাই নয়, জাল সনদের ভিত্তিতে চাকরি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা ২০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩০ টাকা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশব্যাপী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া ৭৩৩ জন জাল সনদধারীর চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন মোস্তফা কামাল (ইনডেক্স নম্বর-১০২৮০৯৭)। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ৪৭১ জন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ২৬২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল সনদের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৪৭১ জনের মধ্যে ১৯৪ জন এনটিআরসিএ সনদ, ২২৯ জন কম্পিউটার সনদ এবং ৪৮ জন বিএড, বিপিএড, গ্রন্থাগারসহ অন্যান্য শিক্ষাগত সনদ জাল করে চাকরি নিয়েছেন। অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের ২৬২ জনের মধ্যে ২৫১ জন এনটিআরসিএ সনদ এবং ১১ জন অন্যান্য সনদ জাল করেছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। নিয়োগের সময় জমা দেওয়া কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ডিআইএ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজ ও অফিসিয়াল রেকর্ড ঘেঁটে দেখে, মোস্তফা কামালের নামে বগুড়ার ‘নেকটার’-এ (জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি) কোনো সনদের অস্তিত্বই নেই। অর্থাৎ সম্পূর্ণ মনগড়া ও জাল সনদের ওপর ভর করেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেন এবং পরে থাইংখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও বাগিয়ে নেন।

এর আগে তিনি পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ আরও বিস্ফোরক। তাদের দাবি, মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন ‘মোস্তফা কম্পিউটার’ নামের দোকানটি দীর্ঘদিন ধরে জাল সনদ তৈরির গোপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীকে ভুয়া সনদ সরবরাহ করেছেন তিনি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্রের দাবি, জালিয়াতির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর চাকরি ও আইনি জটিলতা এড়াতে অভিযুক্ত মোস্তফা কামাল এখন রাজধানীর শিক্ষা ভবন ও মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন। এমনকি অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করতে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেনের চেষ্টাও করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মোস্তফা কামাল দাবি করেছেন, ‘গত ৩০ এপ্রিল অডিট আপত্তির দায় থেকে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছে।’ তবে এ দাবির পক্ষে কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেননি তিনি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে এ বিষয়ে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে কক্সবাজার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমার পূর্বে শিক্ষা অফিসার যিনি ছিলেন, আপনারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে ডিআইএ জাল সনদ শনাক্তে অভিযান চালিয়ে আসছে। এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতেও ৬৭৮ জন স্কুল-কলেজ শিক্ষক-কর্মচারী এবং প্রায় ২০০ জন কারিগরি ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানের জাল সনদধারীর তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া অনেক ব্যবস্থা উচ্চ আদালতে রিটের কারণে এখনো ঝুলে আছে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ