৬ নভেম্বর ২০২৬

আটক ৬

টেকনাফের পাহাড়ে মানব পাচারের ভয়ংকর আস্তানা, ৫৬ জিম্মি উদ্ধার

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ৫৬ জন জিম্মিকে উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। এ সময় মানব পাচারকারী চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের সবাই পুরুষ।

বৃহস্পতিবার বিকেলে হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর পাহাড়ে শুরু হওয়া এ অভিযানে সশস্ত্র পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর সৈনিক তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন। এদিকে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে শুক্রবার বিকেলে উখিয়া ও টেকনাফে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি।

শুক্রবার সকালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করে যৌথ বাহিনী। যৌথ বাহিনী সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে মানব পাচারবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। একপর্যায়ে পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র পাচারকারীরা যৌথ বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পাল্টা গোলাগুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক তিতাস শেখ গুলিবিদ্ধ হন।

তাঁর কাঁধের কাছে গুলি লাগে। স্থানীয় মেডিকেল অফিসার প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হচ্ছিল। পথে তাঁর মৃত্যু হয়। নিহত তিতাস ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে। তিনি সেনাবাহিনীর ০১ বীর ইউনিটের সদস্য ছিলেন এবং টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। প্রায় নয় বছর ধরে তিনি সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

অভিযানে আটক ছয়জনের কাছ থেকে দুটি মুঠোফোন, তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র, দুটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র, চারটি অ্যামুনিশন, একটি দেশীয় তৈরি পিস্তল ও একটি একনলা বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

আট দিন ঝুপড়িতে বন্দী
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। মানব পাচারকারীদের পাহাড়ি আস্তানার একটি ঝুপড়িতে আট দিন ধরে বন্দী ছিলেন তিনি। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

শুক্রবার থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসাদুজ্জামান বলেন, আট দিন ধরে তাঁকে পাহাড়ের একটি ঝুপড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল। পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল। পালানোর চেষ্টা করেও তাঁদের চোখ ফাঁকি দিতে পারেননি।

আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারের একটি ব্রিজে চাকরি করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইমামুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর মুঠোফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে পাহাড়ে নিয়ে তাঁকে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পাহাড়ে গিয়ে তাঁর মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে থাকতে দেখেন তিনি। দুই দিন আগে তাঁদের কয়েকজনকে ট্রলারে করে সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তবে জায়গা না থাকায় সেদিন তাঁকে ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তাঁদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল বলে জানান তিনি।

দুজনকে এক লাখ টাকায় বিক্রির অভিযোগ
উদ্ধার হওয়া উখিয়ার ছেপটখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও সাগরের অভিযোগ, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামের এক দালাল তাঁদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।

সাইফুল ও সাগর জানান, পাঁচ দিন ধরে তাঁরা দেখেছেন, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ পাহাড়ের ওই আস্তানায় আনা হচ্ছে। কেউ কথা বলতে চাইলে তাঁকে মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তাঁদেরও মারধরের শিকার হতে হয়েছে। পরে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

তাঁদের ভাষ্য, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। ক্ষুধা ও নির্যাতনে তাঁদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। বৃহস্পতিবার তাঁদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।

উদ্ধার হওয়া অন্য ব্যক্তিদের অভিযোগ, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁদের পাহাড়ের আস্তানায় এনে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে মারধর ও নির্যাতনের পাশাপাশি পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করত পাচারকারীরা। কাউকে কাউকে শিকল দিয়ে বেঁধেও রাখা হয়েছিল।

সেনাসদস্য নিহতের প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভ
সেনাসদস্য তিতাস শেখ নিহতের ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে উখিয়া ও টেকনাফে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বিএনপি।

উখিয়া উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে উখিয়া স্টেশনে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত পথসভায় বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাইদুল সিকদার, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রিদুয়ান রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল করিম রিয়াদ।

অন্যদিকে টেকনাফ সদর স্টেশনে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে টেকনাফ উপজেলা বিএনপি। এতে বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসান ছিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, টেকনাফ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক ও এনামুল হক।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, দায়িত্ব পালনকালে একজন সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক। তাঁরা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই সঙ্গে পাহাড়ে সন্ত্রাসী ও মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে কার্যকর অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানান।

পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রঙ্গীখালীসহ টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার ও অপহরণকারী চক্রের তৎপরতা রয়েছে। প্রায়ই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র অপরাধীদের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

হ্নীলা এলাকার বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান ছাড়া মানব পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে সশস্ত্র ব্যক্তিদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে অভিযান প্রয়োজন।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।

পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

ওসি আরও বলেন, প্রথমে ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে একজন দালাল ছিলেন। এ কারণে প্রকৃত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৫৬।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধনের বিষয়েও তাঁরা খোঁজখবর রাখছেন।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ