বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী (লালমনিরহাট) মো. তাকি আল জাওয়াদকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ের অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করা একজন কর্মকর্তাকে কোন আইন বা বিধির আওতায় পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা ও একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মো. তাকি আল জাওয়াদ ২০২৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেন। এর পর তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রেলওয়ের মালামাল ক্রয়ে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানও হয়েছিল। এ বিষয়ে দুদকের স্যাম্পল মামলা নং-৫২/২১ এবং পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি সূত্রগুলোর। তবে এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, মো. তাকি আল জাওয়াদ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিদেশে চলে যান। অভিযোগকারী সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘ সময় রেলওয়ের সঙ্গে কোনো কর্মসম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তাকে পুনরায় আগের পদে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তার চাকরি থেকে অব্যাহতির বিষয়টি সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপরও তাকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন এবং রেলপথ সচিব ফাহিমুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধানে বিনা অনুমতিতে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের বিষয়টি শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারী সূত্রগুলোর দাবি, অতীতে একই ধরনের ঘটনায় রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৪ শাখার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্তের পর কোনো সরকারি কর্মচারীকে বরখাস্ত, অপসারণ, নিম্নপদে পদাবনমিত বা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া না হলে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল বা সমপদমর্যাদায় বহাল করার বিধান রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিধান মূলত সাময়িক বরখাস্ত বা শাস্তিমূলক কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য। ফলে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া কোনো কর্মকর্তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এর আইনগত প্রয়োগ কতটা প্রাসঙ্গিক— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একই বিধিমালার ১২ বিধিতে সাময়িক বরখাস্তের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কার্যক্রম চলাকালে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এবং আদালত বা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের আদেশে বরখাস্ত, অপসারণ বা বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ বাতিল হলে পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, মো. তাকি আল জাওয়াদ যেহেতু স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছিলেন, তাই তাকে পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে কোন আইন, বিধি বা সরকারি আদেশের আওতায় তা করা হচ্ছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেলপথ সচিব এবং মো. তাকি আল জাওয়াদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক মো. আল-আমিনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। কল রিসিভ না করায় তিনি খুদে বার্তার মাধ্যমে প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে তার আর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মো. তাকি আল জাওয়াদের বক্তব্য জানতে তার অস্ট্রেলিয়ান মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হয় এবং খুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তদন্তাধীন রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’













