২২ অক্টোবর ২০২৬

অর্থ লেনদেনের অডিও-ভিডিও হাতে

‘ফোন ১.৮৩ লাখ, এরপর নগদ’— এসআই ইয়াছিনকে ঘিরে ব্যবসায়ীর অভিযোগ

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) বন্দর থানার সাবেক ও বর্তমানে হালিশহর থানায় কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াছিনের বিরুদ্ধে এক ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া, মামলা দিয়ে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বন্দর এলাকার ব্যবসায়ী মো. নূর উদ্দিন।

১৮ আগস্ট ২০২৬ দেওয়া লিখিত অভিযোগে নূর উদ্দিন দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে এসআই ইয়াছিনকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন, ৫০ হাজার টাকা ও ২১ হাজার টাকা দিয়েছেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা এবং মামলা মীমাংসার কথা বলে অর্থ লেনদেনেরও অভিযোগ করেন তিনি।

এসব অভিযোগের পক্ষে তাঁর কাছে অর্থ লেনদেনের ভিডিও, কথোপকথনের অডিও ও বিভিন্ন নথি রয়েছে বলে দাবি করেন নূর উদ্দিন।

নূর উদ্দিনের অভিযোগ অনুযায়ী, বারিক বিল্ডিং এলাকার সাবের প্লাজার চতুর্থ তলায় তাঁর ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়িক সূত্রে বন্দর থানায় কর্মরত এসআই ইয়াছিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। একপর্যায়ে ইয়াছিন নিজের মোবাইল ফোন নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়ে নতুন ফোন কিনে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসে তাঁর সঙ্গে গিয়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা দিয়ে ফোনটি কিনে দেন নূর উদ্দিন। তবে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে অর্থ চাওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন নূর উদ্দিন। একপর্যায়ে তাঁর গাড়িচালক বিপ্লবকে থানায় নেওয়া হয়। তাঁকে ছাড়াতে ১ লাখ টাকা চাওয়া এবং টাকা না দিলে চার-পাঁচটি মামলা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি। পরে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও বিপ্লবকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৮ ধারায় আদালতে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন নূর উদ্দিন।

তাঁর অভিযোগ, এরপর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তাঁর কাছেও টাকা চাওয়া হতো। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ আরও ২১ হাজার টাকা দেওয়ার কথা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি। ওই লেনদেনের ভিডিও তাঁর কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন।

লিখিত অভিযোগে নূর উদ্দিন আরও দাবি করেন, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে তাঁকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছেও লিখিত অভিযোগ করেন বলে জানান তিনি।

এরপর ১১ মে ২০২৬ বন্দর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় নূর উদ্দিন ও তাঁর গাড়িচালককে আসামি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলাটির নম্বর-১৪। মামলায় বিভিন্ন অবৈধ মালামাল জব্দের তথ্য রয়েছে। তবে এসব মালামালের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন নূর উদ্দিন।

মামলা হওয়ার আগে পুলিশকে অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। মামলার বাদী মোহাম্মদ জামাল হোসেনকে এসআই ইয়াছিনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করেছেন নূর উদ্দিন।

তাঁর অভিযোগ, জামালকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ব্যবহার করে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নূর উদ্দিনের সরবরাহ করা পুলিশের নথিতে জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে আগের একটি মামলার তথ্যও রয়েছে।

নথি অনুযায়ী, বন্দর থানার এফআইআর নম্বর-১২, ১৮ মার্চ ২০২৪-এর ওই মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৭ ও ১০৯ ধারায় তাঁকে আসামি করা হয়। ২৭ মার্চ ২০২৪ তাঁকে গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে ৩০ জুন ২০২৫ দেওয়া চার্জশিটে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়।

নথিতে বিদেশে রপ্তানির জন্য পাঠানো গার্মেন্টস পণ্য কাভার্ডভ্যান থেকে আত্মসাৎ করে বাইরে বিক্রির অভিযোগে বন্দর থানা পুলিশের হাতে পাঁচজন গ্রেপ্তারের তথ্যও রয়েছে। তাঁদের মধ্যে জামাল হোসেনের নাম রয়েছে।

অডিও-ভিডিওতে অর্থ লেনদেনের দাবি
নূর উদ্দিনের অভিযোগের সমর্থনে প্রতিবেদকের হাতে আসা ৪৯ সেকেন্ডের একটি অডিওতে ইয়াছিনের কণ্ঠ বলে দাবি করা একটি কণ্ঠ শোনা যায়। সেখানে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে কথোপকথন রয়েছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গও আসে।

তবে অডিওটির কণ্ঠ কার এবং কথোপকথনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী— তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।নএ ছাড়া প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিওতে একজন ব্যক্তিকে ইয়াছিনের হাতে টাকা দিতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।

আরেকটি কথোপকথনেও টাকা নেওয়া এবং একটি কাজ করে দেওয়ার প্রসঙ্গ রয়েছে। এসব অডিও-ভিডিওর সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন।

মামলার পর সেটি মীমাংসার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন নূর উদ্দিন। তাঁর দাবি, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে জামাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটি অডিওতে জামালকে ২ লাখ টাকা পাওয়ার কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করেন তিনি। একই কথোপকথনে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান নূর উদ্দিন।

নূর উদ্দিন বলেন, ‘মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে বাদী নিজেই বলেছে, সে ২ লাখ টাকা পেয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আগে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তুলে নিতে হবে। এসব কথার রেকর্ড আমার কাছে আছে।’

নূর উদ্দিনের সরবরাহ করা কাগজপত্রের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগের ২০২৫–২০২৬ কর নির্ধারণী বছরের আয়কর সনদও রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বলে জানান। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাটি হয়রানিমূলক; এতে তাঁর ব্যবসায়িক সুনাম ও পারিবারিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফোনে সাড়া দেননি এসআই ইয়াছিন
অভিযোগের বিষয়ে এসআই মো. ইয়াছিনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও এর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপর একটি সূত্রের দাবি, ঘটনাটির সূত্রপাত মূলত গাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ থেকে। ওই সূত্রের ভাষ্য, অভিযোগকারী ও এসআই ইয়াছিনের মধ্যে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। অভিযোগকারী বিভিন্ন সময়ে গাড়ি ভাড়া নিতেন এবং ভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধ করতেন। পরে গাড়ি ভাড়ার কিছু টাকা বাকি বা আটকে থাকাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে বলে ওই সূত্র দাবি করেছে। তবে এ বক্তব্যেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সিএমপির মিডিয়া ও জনসংযোগ কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) আমিনুর রশিদ বলেন, ‘যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতেই পারে। তদন্ত করে অভিযোগটি সঠিক কি না, তা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।’

অভিযোগ, অডিও-ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা ও অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন