বাংলাধারা প্রতিবেদক»
কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত রেলওয়ের নতুন মাফিয়া ‘বিশ্বাস সিন্ডিকেট’। মোঃ আফসার বিশ্বাস, যিনি নিজস্ব মহলে পরিচিত ‘রেল বিশ্বাস’ নামে। এক হাতেই নিয়ন্ত্রণ করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চল) সব টেন্ডার।
তার আধিপত্যের প্রভাবে যে কোনো টেন্ডারেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। কিছু অসৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিজের ইশারায় ব্যবহার করে টেন্ডারে আধিপত্য বিস্তার করে মোঃ আফসার বিশ্বাস। বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য জরুরি চাহিদা পত্র অনুমোদনের জন্য তোড়জোড়ও শুরু করে তারা। যার ফলে বিরাট অংকের টাকার লোকসানের সম্মুখীন হয় রেলওয়ে।
তবে নাটোর-২ আসনের সাংসদ শফিকুল ইসলাম এই ‘বিশ্বাস সিন্ডিকেটের’ বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। এবং শীঘ্রই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নাম গোপন রাখার শর্তে এক রেলওয়ে কর্মকর্তা জানান, ‘আফসার বিশ্বাস সম্প্রতি ই-টেন্ডার আইডি নং-৪০৮৬৫০ এর কার্যাদেশের অর্ধেকেরও কম পাথর সরবরাহ করে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে তুলে নিয়েছেন প্রায় ২০ কোটি টাকা। এছাড়াও গত ১০ বছর ধরে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ দফতর (সিওএস), কেন্দ্রীয় লোকোমেটিভ কারখানা, সৈয়দপুর ক্যারেজ কারখানা, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ কারখানায় রয়েছে তার একক দাপট।‘
তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে রেল অফিসারদের আটক রাখার অভিযোগ আছে। এছাড়াও জানা গেছে তিনি নানাভাবে রেল অফিসারদের বদলির ভয় দেখান এবং ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখান।
সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে কেন্দ্রীয় লোকোমেটিভ কারখানায় (কেলোকা) গত ১০ বছরে যত ইঞ্জিন মেরামতের কাজ হয়েছে তার অধিকাংশই করেছে আফসার বিশ্বাসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস কন্সট্রাকশন, বাঁধন এন্টারপ্রাইজ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটাল, রিপন মেটাল, এআর এন্টারপ্রাইজ, থ্রিএস এন্টারপ্রাইজ। আর তাদের কাজের মান ও খরচ নিয়ে এদিক সেদিক হয় বলে জানিয়েছেন অনেকে।
জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবে গত ২০১৪ সাল থেকে আজ অবধি ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচারের যতগুলো টেন্ডার হয়েছে তার সবটাই ঘুরেফিরে নিয়ম নীতির তোয়াক্তা না করে পেয়েছে কেবল একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটাল। তবে কাজগুলোর প্রতিটি উন্মুক্ত দরপত্রে তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অংশগ্রহণ করে বিশ্বাস কন্সট্রাকশন ও বাঁধন এন্টারপ্রাইজ। এবং সবগুলোই আফসার বিশ্বাসের করা নামে-বেনামের প্রতিষ্ঠান।
প্রতিবছর তার প্রতিষ্ঠানের বাইরে কেউ টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে না। ফলে তিনি এককভাবে সব কাজ পেয়ে থাকেন। কাগজপত্রে আলাদা প্রতিষ্ঠান দেখানো হলেও আসলে সেগুলো তারই প্রতিষ্ঠান।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী একই অর্থবছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাহিদাসম্পন্ন এক ধরনের মালামাল একবারে কেনার নিয়ম। বাংলাদেশ রেলওয়ের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত মহাপরিচালক রোলিং স্টকের (এডিজি) ক্রয়সীমা অনুমোদনের ক্ষমতা ৫০ লাখ, অন্যদিকে মহাপরিচালক (ডিজি) ক্রয়সীমা অনুমোদনের ক্ষমতা ২ কোটি।
চাহিদা মতো কাজ একসঙ্গে শেষ করতে গেলে অর্থের পরিমাণ তাদের ক্রয়সীমার ঊর্ধ্বে চলে যায়। তাই একই কাজকে বহুসংখ্যক চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে কয়েকবারে ভেঙে ভেঙে ডিজি ও এডিজি ক্রয়সীমার মধ্যে রেখে সেই কাজ বাগিয়ে নেন আফসার বিশ্বাস এমন অভিযোগ রেলের প্রতিটি কর্মকর্তার মুখে মুখে।
বিভিন্ন রেল-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা নাম গোপন রাখার শর্তে জানিয়েছেন, আফসার বিশ্বাসের কাছে অধিকাংশ রেল কর্মকর্তা অসহায়। নানা কারণে তাকে কাজ দিতে তারা বাধ্য হয়ে থাকে। বিশ্বাস সিন্ডিকেটের ভয়ে অনেকেই দরপত্রে অংশ নিতে ভয় পান বলেও জানায় তারা।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, পার্বতীপুরে থাকা কেন্দ্রীয় লোকোমেটিভ কারখানার ভেতরে প্রধান নির্বাহীর বাংলোটি মাত্র আট হাজার টাকা চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদে বরাদ্দ পেয়েছে। অথচ সরকারি ভাড়া অনুযায়ী ওই বাংলোর ভাড়া ২০ হাজার। সেখানে তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজের পাশাপাশি থাকছেন বলেও জানা গেছে। খরচও করছেন সরকারি বিদ্যু, দিচ্ছেন না বিদ্যুৎ বকেয়া বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। বিল পরিশোধের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জোড় দিলে তারা কর্মকর্তাদের বদলির ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই খাতে তো অনেক প্রতিষ্ঠানই কাজ করে। তবে বিষয়টি আমার জানা নাই। তবে তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‘
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












