শাহ আব্দুল্লাহ আল রাহাত »
রাতে মাথা গোঁজার জন্য একটি কুঁড়ে ঘর আর পেটে দু’মুঠো ভাত পড়লেই কেটে যায় বেলা। জীবন জীবিকার টানে সকালে বেরিয়ে যাওয়া আর সন্ধ্যায় ফিরে আসা ক্ষুধার্ত পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে এভাবে কেটে যায় বছরের পর বছর। আর এই জীবন-জীবিকাই তাদের বেঁচে থাকার সন্ধি। তাতেই চলে যায় মরণ অব্দি। এভাবে জীবন-জীবিকার সমন্বয়ে চলে যায় একটি সম্প্রদায়ের ৫ হাজার মানুষের নিত্যদিন।
পূর্বের পাহাড় বেষ্টনী দিয়ে নিংড়ানো মিরসরাই নামক জনপদটিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে সম্প্রদায়টি। যারা বেদে সম্প্রদায় নামে অধিক পরিচিত। উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজার এবং বিশ্বরোড সংযোগ সড়কের দুই পাশে প্রায় ২ একর জায়গার উপর বেদে সম্প্রদায়টি দিয়ে গড়ে ওঠেছে বেদে পাড়া, যার উত্তর অংশ জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের ৭নং ওর্য়াড এবং দক্ষিণ অংশ ৮নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৪-৫ হাজার। যাদের প্রত্যেকেই নিজেদের আদি পুরুষদের পেশায় নিয়োজিত। যেগুলো মধ্যে অন্যতম বানরের খেলা, গননা, সাপ নাচানো, হারানো স্বর্ণ কুড়ানো, ঝাড়ফুঁকসহ আরো কয়েকটি পেশায় তারা নিয়োজিত।অনেকেই অটোরিক্সা চালিয়েও জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।
দেশব্যাপী করোনার বিস্তার লাভ করায় সরকার ঘোষিত লকডাউনের ফলে থমকে গেছে এখানে বসবাসরত ৪০০ পরিবারের আয়ের উৎসগুলো।সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে অনেকটা গৃহবন্দী হয়ে তাদের মানতে হচ্ছে লকডাউন। এমতাবস্থায় অনেকটা মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে এখানে বসবাসরত মানুষগুলোকে। যারা প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ছুটে যেতো তারাই এখন কর্মহীন। তাইতো এখানকার কুঁড়ে ঘরগুলোতে অবুঝ ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না। সাদা ভাতের হাঁড়ি এখন কেবলই ফাঁকা, নেই খাদ্যব্যবস্থা। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে সরকারিভাবে ত্রাণ পেলেও সেগুলো ফুরিয়ে গেছে। অভাব লেগেই আছে পরিবারগুলোতে, নেই কোনো অর্থের যোগান। টাকাই বা আসবে কি করে। লকডাউনে বন্দি জীবিকা নির্বাহের পথগুলো।
শুধু তাই নয়, এদিকে পাড়াটি যেমন রয়েছে অভাব-অনটন তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে আরো ব্যাপক হারে। অত্যন্ত নোংড়া পরিবেশের সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় তাদের। পঁচা ডোবা কিংবা খোলা টয়লেটের পাশে করতে হয় রান্না বান্নার কাজ।পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা একদম নেই বললে চলে। মাসের পর মাস রাস্তায় ধারে ড্রেনে জমা থাকে আবর্জনা এবং পঁচা খাবারের উচ্ছিষ্ট। নির্মল বায়ু গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই এখানে অথচ প্রায় একসাথে বসবাস করছেন ৬ থেকে ৭ হাজার মানুষ। যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ শিশু, নারী ও অল্প সংখ্যাক বয়স্ক লোক। করোনা মহামারিতে বারবার কথা বলা হলেও এখানে স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে বসবাস করার কোনো সুযোগ নেই বললে চলে, নেই হোম কোয়ারান্টাইনে থাকার মতো নূন্যতম পরিবেশও।
একদিকে অভাব অন্যদিকে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, আরেকদিকে মহামারি। সবমিলিয়ে ভালো নেই বেদে পাড়ার মানুষগুলো। মৃত্যু মানে চিরবিদায়। আর সেই চিরবিদায় হতে পারে করোনার আক্রমণে, স্বাস্থ্যহীনতার প্রভাবে, খাদ্যের অভাবে।
বেদে পাড়ার বাসিন্দা জাকির জানান, করোনার প্রভাবে আমারা কর্মহীন। কাজ না করলে আমাদের চলার কোনো উপায় নেই। তাছাড়া আমরা বাস করি ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায়, যেখানকার পরিবেশ অত্যন্ত নোংড়া ও করোনা ঝুঁকিপূর্ণ।
জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুকছুদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে থেকে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর পাশাপাশি বেদে পাড়ায় ৪০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি। এছাড়া উপজেলা এসিল্যান্ড অফিসারের পক্ষ হতে আমরা ১৮০টি হতদরিদ্র পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বেদে পাড়াসহ ইউনিয়নব্যাপী আমাদের সচেতনতামূলক মাইকিংও চলছে।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ













