মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবার ভর্তুকির সার পাচারের নতুন রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার শঙ্খনদীসংলগ্ন কয়েকটি ঘাট ও উপকূলীয় নদীপথ ব্যবহার করে ইউরিয়া সার সংগ্রহের পর সাগরপথে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ঘটনায় সংঘবদ্ধ একটি চক্রের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আনোয়ারার বারখাইন, হাইলধর, রায়পুর ও জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের নদীসংলগ্ন কয়েকটি এলাকাকে সার পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব এলাকা থেকে নৌপথে সার সংগ্রহ করে উপকূলীয় সাগরপথ দিয়ে মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার থেকে ট্রলারে করে দেশে ইয়াবা আনার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশে সরকারি ভর্তুকির কারণে তুলনামূলক কম দামে ইউরিয়া সার পাওয়া যায়। অন্যদিকে মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণে সারের চাহিদা বেড়েছে। দুই দেশের বাজারদরের এই ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা অধিক মুনাফার আশায় সার পাচার করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হিসাবে, এক হাজার বস্তা সার মিয়ানমারে পাচার করা সম্ভব হলে চালানটির মূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তিনটি সার কারখানার উৎপাদিত সার নিয়ে উদ্বেগ
আনোয়ারায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি মিলিয়ে তিনটি সার কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত সার এবং ডিলারদের বরাদ্দ করা ভর্তুকির সার পাচারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে নদীপথে অবৈধভাবে সার পাচারের সময় কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর অভিযানে একাধিক চালান জব্দ হয়েছে বলে জানা গেছে। জব্দ করা সারের মধ্যে আনোয়ারায় অবস্থিত কাফকো সার কারখানায় উৎপাদিত সারও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সার ব্যবসায়ী জানান, আনোয়ারার উপকূলঘেঁষা কয়েকটি ইউনিয়নের নির্দিষ্ট তিনটি নদীঘাট ব্যবহার করে সার পাচার করা হচ্ছে বলে তাঁদের ধারণা। এসব চালানের সঙ্গে কারা জড়িত, তা স্থানীয় অনেকেরই জানা বলে দাবি তাঁদের। তাঁরা প্রশাসনের অভিযান জোরদার করে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সার সংকটের আশঙ্কা
মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এতে সার, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে পাচারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ভর্তুকির সার পাচার অব্যাহত থাকলে দেশের বিভিন্ন জেলায় সার সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে সারের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির অর্থের অপব্যবহার ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
তবে আনোয়ারা উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, বর্তমানে উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের চাহিদা পূরণে উপজেলায় আটজন সার ডিলার রয়েছেন। কৃষি অফিসের চাহিদার ভিত্তিতে কারখানা থেকেও সার সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ সরকার বলেন, সার পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে। সমন্বিতভাবে নজরদারি করা হলে সার পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে।
উপকূলে একের পর এক সার জব্দ
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় পরপর কয়েকটি সারের চালান জব্দের ঘটনায় মিয়ানমারে সার পাচারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ঘাটে মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগে ৬০০ বস্তা বা ৩০ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। জব্দ করা সারের আনুমানিক বাজারমূল্য ২১ লাখ টাকা।
এর পরদিন, ২৫ সেপ্টেম্বর মিরসরাইয়ের ইছাখালী ঘাট এলাকায় চারটি ট্রাক থেকে মাছ ধরার নৌযানে সার তোলার সময় ৯৬০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়। ৫০ কেজি ওজনের এসব বস্তায় মোট ৪৮ টন সার ছিল। জব্দ করা সারের আনুমানিক মূল্য ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় ৪১০ বস্তা ইউরিয়া এবং হালিশহরের দাবিরখাল এলাকায় ১১ টন সার মিয়ানমারে পাচারের চেষ্টার সময় জব্দ করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর বাঁশবাড়িয়া ঘাটে আরও ৩৫ টন ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়।
‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ চালু
আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, আনোয়ারার কোনো নদীঘাট ব্যবহার করে মিয়ানমারে সার পাচারের তথ্য তাঁরা পাননি। তবে সার পাচার রোধে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হবে।
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের জোনাল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. মিনহাজুল আলম বলেন, সার পাচার রোধে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের নির্দেশনায় ‘অপারেশন সার সুরক্ষা’ চালু করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় অভিযান চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, ভাটিয়ারী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের কয়েকটি এলাকায় সার সংগ্রহ ও পাচারের সঙ্গে একটি চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ব জোনের চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ৯৫ জন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় ১৫টি মামলা করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, জব্দ করা আলামতের বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরে জব্দ করা সার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আনোয়ারার নদীপথে সার পাচারের অভিযোগের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে উপকূলজুড়ে ধারাবাহিক চালান জব্দের ঘটনায় সার পাচার প্রতিরোধে নদীঘাট ও সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদারের দাবি উঠেছে।












