চট্টগ্রাম নগরীতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক জরিপে। জরিপে দেখা গেছে, নগরের প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ২৭টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ডেঙ্গু ঝুঁকি নির্ধারণের তিনটি সূচকেই চট্টগ্রাম উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্য বিভাগ নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ‘রেড জোন’ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপ পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। সম্প্রতি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে ডেঙ্গু প্রতিরোধে চার দফা জরুরি সুপারিশও করা হয়েছে।
জরিপে নগরের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়েছে, যা হাউস ইনডেক্স অনুযায়ী ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এছাড়া পরীক্ষা করা ৩৪৫টি পানির পাত্রের মধ্যে ১১৪টিতে লার্ভা পাওয়া গেছে। কনটেইনার ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ব্রেটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিনটি সূচকই স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি এবং উচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
জরিপে ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এসির ট্রে, ফ্রিজের ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, মাটির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। এবার প্রথমবারের মতো নির্মাণাধীন ভবনের ফ্লোরেও লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সংগ্রহ করা লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই এবং বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস অ্যালবোপিকটাস।
ভারপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ মঈন উদ্দীন বলেন, নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের জন্য রাখা জায়গার পাশাপাশি এবার ভবনের ফ্লোরেও এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বায়েজিদ ও শেরশাহ এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
জরিপ বিশ্লেষণ করে উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা—এই আটটি ওয়ার্ডকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত জেলায় ২৮০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১০৪ জন। আক্রান্তদের বড় অংশই নগর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, জরিপের সুপারিশসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন মজুত, নার্সদের প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। সাধারণত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে।
প্রতিবেদনে কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, সম্ভাব্য প্রজননস্থলে বিশেষ নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা দমনে কার্যকর কীটনাশক ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম জানান, নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত আটটি ওয়ার্ডে বিশেষ নজরদারি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং আক্রান্ত রোগীর বাড়ির আশপাশে বিশেষভাবে ওষুধ ছিটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।














