৩০ অক্টোবর ২০২৬

দুদকের আপিল, খালাসী নিয়োগ ও সম্পদ নিয়ে নতুন প্রশ্ন

‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে চাকরি, অবসরের পরও বহাল রেলের শীর্ষ প্রকৌশলী

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (এমএম) (পূর্ব) তরুণ কান্তিকে সরকারি চাকরির নির্ধারিত অবসরের বয়স অতিক্রম করার পরও দায়িত্বে বহাল রাখার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় হাইকোর্টে চলমান আপিলের তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে চাকরি ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এছাড়া ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে নিয়োগ, খালাসী নিয়োগে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগসহ একাধিক বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

চাকরিসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, তরুণ কান্তি বালার জন্মতারিখ ২০ অক্টোবর ১৯৬৬। সে হিসেবে সরকারি চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা অনুযায়ী তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ২০ অক্টোবর ২০২৫। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় পার হওয়ার পরও তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

দুদকের আপিল গোপনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, তরুণ কান্তি বালার বিরুদ্ধে দুদকের করা একটি মামলার নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সংস্থাটি ২০১৯ সালের ২২ জুলাই হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল নং-৬৯৯০/২০১৯ দায়ের করে। নথি অনুযায়ী, আপিলটি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আদেশ দেন হাইকোর্ট।

অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, আপিলটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলেও তরুণ কান্তি বালা বিষয়টি যথাযথভাবে উল্লেখ না করে চাকরিতে বহাল থাকা এবং বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখতে আইবাস-এ মাস্টার ডাটা অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছেও পৃথক আবেদন পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আপিলটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এর আইনি অবস্থান এবং সরকারি চাকরিতে এর প্রভাব কী— সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আদালতের কার্যতালিকা অনুযায়ী, মামলাটি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য তালিকাভুক্ত ছিল।

অবসরের পরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
অভিযোগ রয়েছে, অবসরের নির্ধারিত সময়ের আগেই এবং পরবর্তীতেও তরুণ কান্তি বালাকে রেলওয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (এমএম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৪ অক্টোবর ২০২৫ পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী (সিপিও) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর ১৮ নভেম্বর ২০২৫ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) (পূর্ব) এবং ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, নির্ধারিত অবসরের তারিখ অতিক্রম করার পর কোন আইন, বিধি বা সরকারি আদেশের আওতায় এসব দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়ে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
তরুণ কান্তি বালা ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগে যোগ দেন। তবে নথির ভিত্তিতে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, তাকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

তাদের দাবি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বয়স ছিল প্রায় পাঁচ বছর ছয় মাস। ফলে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি এবং সেই ভিত্তিতে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সনদ, যাচাই প্রতিবেদন ও নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

খালাসী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
২০১৩ সালে ৮৬৩ জন খালাসী নিয়োগে পোষ্য কোটার অনিয়ম নিয়েও তরুণ কান্তি বালার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর নিয়োগবঞ্চিতদের বিষয়টি যাচাইয়ে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, ৪০ শতাংশ পোষ্য কোটা বাস্তবায়নের তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করেই তিনি প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য মহাপরিচালকের কাছে পাঠান। পরে ৬৬ জনকে খালাসী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সম্পদ নিয়েও অভিযোগ
তরুণ কান্তি বালার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন, ভারতে সম্পদ থাকা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না আসায় সেগুলো বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

যা বললেন তরুণ কান্তি বালা
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তরুণ কান্তি বালা সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তবে দাবির পক্ষে তিনি কোনো নথি বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেননি। পরে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য মেলেনি
অভিযোগকারীদের দাবি, অবসরের বয়স, চলমান মামলা এবং অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে অবগত থাকার পরও তরুণ কান্তি বালাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের কাছে খুদে বার্তায় বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনিও কোনো উত্তর দেননি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

দুদকের বক্তব্য
দুদক, সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর উপপরিচালক মো. আল-আমিন বলেন, যেহেতু মামলাটি নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্টে আপিল হয়েছে, তাই মামলার বিষয়ে এই মুহূর্তে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে তরুণ কান্তি বালার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা দুদকে জমা দিলে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন