মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
আধুনিক যুগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশের পর কেউ খবরও রাখে না। কিন্তু আগেকার দিনে মাধ্যমিক তথা এসএসসি পরীক্ষায় পাশের পর কয়েক গ্রাম বা এলাকা খবর হয়ে যেত। বোঝাই যায় না এখন কে পাশ করলো আর কেই-বা ফেল করলো। শুধু মিষ্টির দোকানগুলো কয়েক মণ মিষ্টি বিক্রি করে ফায়দা লুটছে। পাড়া প্রতিবেশীরা খবরও নেয়না কোন ছেলেটা বা কোন মেয়েটা ভাল পাশ করেছে। তবে ১৯৭০ সালের নোয়াখালীর চন্দ্রগঞ্জ হাই স্কুল থেকে পাশ করা এম কে আলাউদ্দিন জানালেন তাঁর জীবনে মাধ্যমিক পাশের ফলাফল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা। তিনি জানালেন অভিজ্ঞতার কথা ঠিক এমনিভাবে,
‘অবশেষে অপেক্ষার অবসান হোল । উপস্থিত হল বহু প্রতীক্ষিত সেইদিন । সকাল থেকেই আকাশ টা মেঘলা ছিল । মাঝে মাঝে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল । জীবনের অনেক ঘটনা অনেক স্মৃতি সারাজীবনেও এতটুকু মলিন হয় না । এটা তেমনই একটি । বাড়িতে শুয়ে বসে অলস সময় পার করছিলাম । আর প্রতিদিনের মতো রেডিও টা অন করে খবর নয়তো গান শুনছিলাম । আমাদের একটা ৩ ব্যান্ড এর ন্যাশনাল ৮ ট্রানজিস্টার রেডিও ছিল ।যখনকার কথা বলছি , তখন সৌখিন লোকেরা এদিক সেদিক যাওয়া আসার সময় হাতে ছোট খাট রেডিও সাথে নিয়ে বের হত । প্রায় এখনকার অনেকের মোবাইল হাতে নিয়ে বেড়ানোর মত । বিকেল চারটার দিকে একটি বিশেষ ঘোষণায় বলা হল , আজ কুমিল্লা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধিনস্ত মাধ্যমিক পরিক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হবে । বোর্ড প্রাঙ্গনে ফলাফলের তালিকা প্রকাশ করা হবে ।তখনকার সময়ে স্কুলে স্কুলে ফলাফল আসতে ৫/৭ দিন সময় লেগে যেত । তাই স্কুল থেকে এক দু’জন শিক্ষক পাঠিয়ে ফলাফল সংগ্রহ করা হত । খবরের কাগজেও প্রকাশ হত , তবে কখন ও কখন তাতে অনেক ভুল থাকতো বা আংশিক ছাপা হত । একটু ও দেরী না করে জামাটা গায়ে চাপিয়ে বড় আপাকে বলে বের হলাম আমাদের বাড়ির সামনে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের সামনের দোকানের দিকে , যেখানে সকাল সন্ধ্যায় আড্ডা দেই । সেখানে গিয়ে দেখি মাইঝের বাড়ির (মসজিদ আলা বাড়ি ও বলা হত) গোলাম সারয়ার (সুকা) বর্তমানে মনে হয় শিপে চাকুরীরত, ওর বাবা ও শিপে চাকুরী করতেন । সে ও আমার সাথে পরীক্ষা দিয়েছিল । বলল, যাবা নাকি কুমিল্লা! দু’জন মিলে রওয়ানা হলাম । স্মৃতি এতো স্পষ্ট যে অবাক হয়ে যাই , এর পরের অনেক ঘটনা ও ভুলে গেছি , যাই হোক রাস্তা খুব পিচ্ছিল ও কাদাময় । গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও হচ্ছে । মূল সড়ক পর্যন্ত আসতে আধভেজা হয়ে গেছি । কালো রঙের পেছনে ফিতাওয়ালা বাটার স্যান্ডেল ছিল পায়ে , আছাড় খেয়ে পড়াতে ওটা ছিঁড়ে গেলে খালের পানিতে ছুঁড়ে ফেলে খালি পায়েই বাসে উঠি ।চৌমুহনীতে এসে প্রথমে জুয়েলারি সপে গিয়ে হাতের সোনার আংটিটা বিক্রয় করি । ওটা ছিল কিছুদিন আগে আমার ছোট চাচার বিয়েতে গিফট পাওয়া আমার ভাগের টা । যাই হোক ,দাম পাওয়া গেল .৫৪ বা ৫৭ টাকা । সামান্য কিছু খেয়ে দু’জনে ট্রেনে চাপলাম । রাত দুটো অবধি কুমিল্লা পৌঁছুলাম । তর সইছিল না । দু’জনে রিকশা নিলাম বোর্ড অফিস পর্যন্ত ভাড়া চার আনা । সেখানে অনেক ছাত্রদের জটলা । বাঁশের খুঁটিতে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগে বাতি ঝুলানো । সারিবদ্ধ ভাবে বোর্ডে কাগজে সাঁটানো বিভিন্ন কেন্দ্রের রোল নম্বারের পাশাপাশি ফলাফল । ছেলেদের গায়ের ছায়া বোর্ডের উপর পড়াতে আবছা আলো আঁধারিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলোনা বলে কেউ টর্চ বা ম্যাচের কাঠি জেলে নম্বর খুঁজে নিচ্ছিল ।মনের উত্তেজনাকে চাপা দেয়ার জন্যে আমরা একে অপরের নাম্বার দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম । কিছুক্ষন পরে সারয়ার আমাকে বলল , ” তোমার টা পেয়েছি , সেকেন্ড ডিভিশান ” । আমি এবার নিজের চোখে দেখতে চাইলাম, লাল পেন্সিলের লিখা , Roll – 408 . পাশে রোমান সংখ্যায় 2 . ওর টা ও আমি দেখেছি , নিজের আনন্দ চেপে ওর জন্য মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল । ওর রেজাল্ট ছিল একটু খারাপ , বাংলায় রেফারড । সেখান থেকে বের হয়ে দেখি কাদা পানিতে কয়েকজন শুয়ে বা কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে , কেউ কান্নায় মুখ ঢেকে আছে ।এবার পায়ে হেঁটেই রেল ষ্টেশনে আসি । চৌমুহনীতে আসতে সকাল হয়ে গেছে । বাড়ি পৌঁছাতে বড় আপা সামনে এলেন , মা তো নেই , তাঁকে তো অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় হারিয়েছি , উনিই তো মায়ের মতো; মা-ই তো । ছোট ভাই শহীদতো তখনও উনাকে মা ডাকে । সালাম করতেই উনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন । তাঁর চোখে অশ্রু টলমল করছে । আমি জানি এ কান্না আনন্দের , বেদনার । চোখের পানি মুছতে মুছতেই কাউকে খুঁজলেন বাজারে পাঠাবেন জিলাপি আনার জন্য । তখনকার দিনে অত মিষ্টি পাওয়া যেত না , যে কোন সময়েই গরম গরম জিলাপিই ছিল সেরা আপ্যায়নের উপকরণ , নইলে বাতাসা ।‘
তথ্য প্রযুক্তির বিকাশে মোবাইলের আদলে ফেসবুকে ওনারও একটা আইডি রয়েছে। শারিরীক অসুস্থতা আর মানসিক চাপে ৬৮ বছর বয়স্ক এই প্রবীণের কথায় জড়তা চলে এসেছে। কিন্তু তিনি পিছিয়ে নেই আধুনিকতার সঙ্গে। ব্যবহার করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পেইজ। শনিবার দুপুরে তিন তাঁর জীবনের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন তাঁর ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে। তিনি লিখেছেন সত্তরের দশকে কিভাবে তিনি তাঁর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার রেজাল্ট কালেকশন করেছেন।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস













