১ অক্টোবর ২০২৬

মাস্টার প্ল্যান টেন্ডারে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

সিডিএ’র টেন্ডারে ‘অদৃশ্য হাত’, কম দরদাতাদের বাদ দিয়ে চতুর্থ প্রতিষ্ঠানকে কাজ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ‘মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান (২০২০–২০৪১)’ প্রণয়ন প্রকল্পের একটি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আহ্বান করা টেন্ডারে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আর্থিক প্রস্তাবের ক্রমানুসারে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা ‘দ্যা সার্কেল কমিউনিকেশন’কে কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি ও টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী যোগ্যতা যাচাইয়ের পর দরদাতাদের মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার কারণ তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান প্রজেক্ট’ প্রস্তুতের অংশ হিসেবে ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সম্মেলন, টাউন ম্যানেজমেন্ট কমিটি (টিএমসি) সভা, অংশগ্রহণমূলক দ্রুত মূল্যায়ন (পিআরএ), গণশুনানি ও জনসম্পৃক্ততা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডার নম্বর ২৫.৪৭.১৫০০.০৭১.৭৬.০৭৬.২৫-এর বিপরীতে ওপেন টেন্ডারিং মেথডের (ওটিএম) মাধ্যমে সরকারি ই-জিপি সিস্টেমে দরপত্র আহ্বান করা হয়।

টেন্ডারটির জন্য মোট আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— আর্শিনগর মিডিয়া, রুবরিক কমিউনিকেশন, এড অন কমিউনিকেশন লিমিটেড, দ্যা সার্কেল কমিউনিকেশন, বর্ণমালা কমিউনিকেশন এবং পাওয়ার লাইন কম্পিউটার।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান রুবরিক কমিউনিকেশনের স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর আহমেদ রাজের দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠান ই-জিপি ব্যবস্থায় টেন্ডারের সব শর্ত মেনে দরপত্র জমা দেয়। মূল্যায়নের পর দরদরের হিসাবে রুবরিক কমিউনিকেশন দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ছিল ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৩ টাকা।

মঞ্জুর আহমেদ রাজ বলেন, ‘টেন্ডারের শর্ত পূরণ করে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। দরদরের ক্রমানুসারে আমাদের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু আমাদেরসহ প্রথম তিন দরদাতাকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা দ্যা সার্কেল কমিউনিকেশনকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিক কারণ আমাদের জানানো হয়নি।’

তিনি জানান, টেন্ডার আইডি ১২৪৩৭১২-এর বিপরীতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর দ্যা সার্কেল কমিউনিকেশনকে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (নোয়া) দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কম দরদাতাদের বাদ দেওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

অংশগ্রহণকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাবের ক্রমানুসারে আর্শিনগর মিডিয়া, রুবরিক কমিউনিকেশন ও এড অন কমিউনিকেশন লিমিটেড যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল। এরপরও ওই তিন প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে চতুর্থ অবস্থানে থাকা দ্যা সার্কেল কমিউনিকেশনকে কাজ দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

তবে শুধু সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে না— এ বিষয়টিও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, কারিগরি সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় জনবল, নথিপত্রসহ নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছে কি না, তা মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে কেন প্রথম তিন দরদাতাকে অযোগ্য বা অনুপযুক্ত বিবেচনা করা হয়েছে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতার ক্ষেত্রে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধন বা ইনকরপোরেশন সনদ, ই-টিন, ভ্যাট/বিন, সর্বশেষ প্রযোজ্য করবর্ষের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বা ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স, সর্বশেষ তিন অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক সলভেন্সি বা তরল সম্পদ/ক্রেডিট লাইনের প্রমাণ এবং পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতার নথি চাওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এর পাশাপাশি কোম্পানি প্রোফাইল, প্রস্তাবিত জনবলের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি), প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মালিকানা বা ভাড়া নেওয়ার সক্ষমতার প্রমাণ, কাজের পদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন তথ্য দরপত্রের সঙ্গে দাখিল করার কথা ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আবু ইসা আনসারী বলেন, ‘মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান (২০২০–২০৪১) প্রণয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র দাখিল, খোলা, মূল্যায়ন ও চুক্তি সম্পাদনের বিভিন্ন ধাপের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ই-জিপি ব্যবস্থায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। সিডিএ কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার থাকে না। নিশ্চয়ই তাদের কোনো প্রক্রিয়াগত ঘাটতি ছিল।’

টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের বিভিন্ন নথির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধন বা ইনকরপোরেশন সনদ, ই-টিন, ভ্যাট/বিন, আয়কর রিটার্নের প্রমাণ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক সলভেন্সি বা ক্রেডিট লাইন এবং পূর্বের কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিতে হয়। পাশাপাশি কোম্পানি প্রোফাইল, জনবলের সিভি, সরঞ্জামের সক্ষমতা, কাজের পদ্ধতি ও কর্মপরিকল্পনাও দিতে হয়।

তাঁর ভাষ্য, ‘নিশ্চয়ই এসবের কোথাও না কোথাও ঘাপলা আছে।’

এদিকে, টেন্ডার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি ই-জিপিতে সম্পন্ন হলেও মূল্যায়নের পর্যায়ে কোন প্রতিষ্ঠানকে কেন যোগ্য এবং কোন প্রতিষ্ঠানকে কেন অযোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে— তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে তুলনামূলক বেশি দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার কারণ স্পষ্ট না হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, দরদাতাদের যোগ্যতা যাচাইয়ের নথি এবং নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তি প্রকাশ করা হলে প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

রুবরিক কমিউনিকেশনের স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর আহমেদ রাজ বলেন, ‘আমরা ই-জিপির নিয়ম মেনে অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানসহ প্রথম তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চাই। যদি আমাদের কোনো যোগ্যতার ঘাটতি থাকে, সেটিও লিখিতভাবে জানানো উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘টেন্ডারে কোনো অনিয়ম বা প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে। তাই আমরা বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত এ ধরনের বড় প্রকল্পের টেন্ডারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তার পেছনে টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সুস্পষ্ট ও নথিভুক্ত কারণ থাকা জরুরি। তারা বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন