চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় প্রস্তাবিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিকল্পনার মাত্র এক বছরের মধ্যে শয্যাসংখ্যা কমিয়ে আনার এ সিদ্ধান্তে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্ণফুলীবাসীর জন্য পরিকল্পিত ২৫০ শয্যার হাসপাতাল বাস্তবায়ন না করে সেটিকে ৫০ শয্যায় নামিয়ে আনা হচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, অবশিষ্ট ২০০ শয্যার সুবিধা অন্য কোনো উপজেলায় স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে। তবে এ বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আপাতত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রস্তাবনা নিয়ে কার্যক্রম চলছে। ২৫০ শয্যার প্রকল্প বাতিল হয়েছে কি না, সেটি অধিদপ্তরের নীতিগত বিষয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান রিপন বলেন, “এক বছর আগে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের ঘোষণা দিয়ে হঠাৎ সেটিকে ৫০ শয্যায় নামিয়ে আনার পেছনে কোনো না কোনো কারণ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনগণ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সোচ্চার হওয়া উচিত।”
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই কর্ণফুলী উপজেলার ক্রসিং এলাকায় প্রস্তাবিত ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমির সার্ভে ও চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়।
চট্টগ্রামের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের উপস্থিতিতে জমি পরিমাপ ও প্রাথমিক দখল কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এ সময় গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা এবং কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসাও উপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলী ও স্থপতিরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশে প্রায় ৪ দশমিক ৭ একর জমিতে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এক বছর পার হলেও প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদন না পাওয়ায় প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বর্তমানে ২৫০ শয্যার পরিবর্তে ৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রস্তাবনা নিয়ে কার্যক্রম চলছে।
কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ জেবুন্নেসা বলেন, “২৫০ শয্যার হাসপাতাল হচ্ছে না, এটি নিশ্চিত। সর্বশেষ ১০০ শয্যার প্রস্তাবের চিঠি পেয়েছি। পরে সেটিকে ৫০ শয্যা করা হবে বলে শুনেছি। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো অফিসিয়াল চিঠি হাতে পাইনি।”
কর্ণফুলী হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও এলাকায় পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল না থাকায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। গুরুতর রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিজস্ব ভবন না থাকায় বড়উঠান ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে প্রায় ৯৪ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে বহির্বিভাগ চালু থাকলেও পূর্ণাঙ্গ জরুরি ও অন্তঃবিভাগের সুবিধা নেই।
অন্যদিকে কর্ণফুলীকে ঘিরে কোরিয়ান ইপিজেড, সিমেন্ট, ইস্পাত, গার্মেন্টস, ভোজ্যতেল শিল্প এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কয়েক লাখ মানুষের পাশাপাশি হাজারো শিল্পশ্রমিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতালের দাবি জানিয়ে আসছেন এলাকাবাসী।
সচেতন মহলের মতে, কর্ণফুলীতে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মিত হলে শুধু উপজেলার মানুষই নয়, আনোয়ারা, পটিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষও উপকৃত হতেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেত।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রস্তাবিত ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় নামিয়ে আনার বিষয়ে একটি চিঠি এসেছে। তবে এখন সেটিও হচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালটি ১০০ বা ১০১ শয্যার হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো চিঠি পাইনি। তবে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হচ্ছে না—এটি নিশ্চিত।”
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস এবং কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এস এম মামুন মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কর্ণফুলীবাসীর প্রত্যাশা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা আন্তরিক উদ্যোগ নিলে প্রস্তাবিত ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।














