বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাকরির নামে অর্ধশতাধিক বেকার যুবক ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলো— রেলওয়ের সামগ্রী বিভাগের শিপিং দপ্তরের ম্যাটেরিয়াল চেকার মো. হোসাইন ও পরিদর্শন দপ্তরের ম্যাটেরিয়াল চেকার কামরুল ইসলাম।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তারা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন। টাকা নেওয়ার পর চাকরি না দিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধেম্বর কর্মস্থলে অনুপস্থিত— হোসাইন প্রায় ৯ মাস এবং কামরুল প্রায় ৫ মাস ধরে দপ্তরে আসেননি।
চাকরি না হলে টাকা ফেরতের আশ্বাস দিলেও পরে তারা যোগাযোগ এড়িয়ে যান এবং ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা প্রতিনিয়ত রেলওয়ে দপ্তরে তাদের খোঁজ করছেন।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় প্রতারণার চিত্র: চেরাগ আলী (অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী, সিলেট) জানান, ছেলের বদলির জন্য কামরুলকে টাকা দিলেও কাজ না হওয়ায় ফেরত চাইলে তিনি ফোন ধরছেন না।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক হাবিলদার জানান, আত্মীয়ের চাকরির জন্য হোসাইনকে ৯ লাখ টাকা দিয়ে পাঁচ বছরেও টাকা ফেরত পাননি। নূর আলম (পঞ্চগড়) জানান, ‘পোর্টার’ পদে ৪ লাখ টাকা দেওয়ার পর চাকরি না পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে গত ২০২৩ সালের রমজানে চট্টগ্রামের আলকরণ এলাকায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার কাছে থাকা দুটি চেক (২ লাখ টাকার) কেড়ে নেওয়া হয়।
সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘অফিস সহকারী’ পদে ৯ লাখ টাকা দাবি করে ৩ লাখ নগদ ও ৬ লাখের চেক নেওয়া হয়; তবে হোসাইন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আব্দুর রাজ্জাক (বান্দরবান) জানান, ‘গেটকিপার’ পদে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার চুক্তিতে ১.৫ লাখ নগদ ও চেক দেওয়ার পর চাকরি না পেয়ে হোসাইন এখন বিষয়টি অস্বীকার করছেন। এছাড়া বাঁশখালীর এক যুবকের ৪ লাখ ও আরও কয়েকজনের কাছ থেকে ১০-১৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
হোসাইনের বিরুদ্ধে চাকরির নামে অর্থ আত্মসাৎ করে চট্টগ্রামের আলকরণ এলাকায় জমিসহ পাঁচতলা ভবন ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে অনুমোদন ছাড়া স্টেশন রোড, রিয়াজউদ্দিন বাজার, আগ্রাবাদে তার ব্যবসা আছে বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের অবস্থান
হোসাইনকে গত বছরের ৫ নভেম্বর, চলতি বছরের ৩ মার্চ ও ৭ এপ্রিল; এবং কামরুলকে গত ৩১ মার্চ, ২ মে ও ২৪ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কেউই নোটিশ গ্রহণ বা জবাব দেননি।
জেলা সামগ্রী নিয়ন্ত্রক (শিপিং) আসিফুল ইসলাম ও জেলা সামগ্রী নিয়ন্ত্রক (পরিদর্শন) এস এম আল মুহিদ জানিয়েছেন, বিধি অনুযায়ী নোটিশ প্রদান শেষে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এতগুলো অভিযোগ ও দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কেন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—তা এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগের তীব্রতা, ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব (এক দশকের বেশি সময়) বিবেচনায় ভুক্তভোগীরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা দাবি করেছেন। তবে অভিযুক্তদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তারা সাড়া দেননি।বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও কথা বলতে নারাজ।













