১ মার্চ ২০২৬

দোকান দখল করে বিএনপির অফিসের সাইনবোর্ড

অসহায় নারীর অভিযোগ—স্থানীয় এমপি ও ওসিকে জানিয়েও মেলেনি প্রতিকার

চট্টগ্রামের পটিয়ায় এক অসহায় নারীর দোকান জবরদখল করে সেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ইউনিয়ন কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙানোর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ এক মাস ধরে এই দখল চললেও থানা পুলিশ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়নের মৌলভীহাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী রাজিয়া হোসেন (৫৮) দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রতিকারের জন্য হাহাকার করছেন।

অভিযোগকারীর বক্তব্য: ‘এক মাস ধরে দখল, বিচার পাচ্ছি না’

ভুক্তভোগী রাজিয়া হোসেন (৫৮) প্রতিবেদককে জানান, তাঁর স্বামী মোতাহের হোসেন দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোক ও হৃদরোগজনিত জটিলতায় ভুগছেন। তাঁদের ছেলেরা বিদেশে থাকায় অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে তিনি চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। পটিয়ার পেরলা এলাকায় তাঁর স্বামীর পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি দোকান ছিল, যেটির আয় দিয়েই তাঁদের সংসার চলত।

রাজিয়া হোসেনের অভিযোগ, করোনা-পরবর্তী সময়ে দোকানটির ভাড়াটিয়া মারা গেলে এবং স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় দোকানটি কিছুদিন পরিত্যক্ত ছিল। পরে তিনি দোকানটি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য স্থানীয় সেকান্দর নামের এক ঠিকাদারকে এক লাখ সত্তর হাজার টাকা দিয়ে সংস্কারকাজ করান।

“সংস্কার শেষে দোকানটি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও সেকান্দর নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। গত এক মাস ধরে তিনি আমার দোকানটি জবরদখল করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, সেখানে পটিয়া উপজেলাধীন ‘বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়’ লেখা একটি সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে,” বলেন রাজিয়া হোসেন।

তিনি আরও জানান, থানা পুলিশ ও পটিয়া আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম-কে ভোটের আগে বিষয়টি জানালেও কোনো সুরাহা হয়নি। এর মধ্যে এখন তিনি কোনোভাবেই সংসদ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্য মাইকে ঘোষণা দিয়েছিলেন কারও জমি বা দোকান দখল করে চাঁদাবাজি করা বিএনপির কাজ নয়। অথচ এরপরও দোকানটি দখলমুক্ত হয়নি।

“আমি একজন অসহায় নারী। আমার স্বামী অসুস্থ। আমরা কোথায় গিয়ে বিচার পাব?” ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

অভিযুক্তের বক্তব্য:আজ রাতেই সাইনবোর্ড সরিয়ে নেব’ অভিযুক্ত মো. সেকান্দর (৪৫)-এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাইনবোর্ড টাঙানোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “উনি আমাকে দোকানে কাজ করতে দিয়েছিলেন। আমি কীভাবে কাজ করেছি, তার সব কাগজ ওসির কাছে জমা দিয়েছি। দোকান তৈরি হওয়ার পর উনাকে বিএনপির কার্যালয় করার কথাও জানানো হয়েছিল।”

দোকানে কেন বিএনপির ইউনিয়ন কার্যালয়ের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গেও কথা হয়েছে। গতকাল নামানোর কথা ছিল, কিন্তু সরানো হয়নি। বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যার কারণে আজ রাতেই সরিয়ে নেব। একটা সমাধান হবে।”

বিএনপি নেতাদের অবস্থান: এটি কোনো ইউনিয়ন কার্যালয় নয়’

এ বিষয়ে পটিয়া ৯ নম্বর (ক) বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, “এটি কোনো ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয় নয়। এডভোকেট ফোরকানুল ইসলাম ফেসবুকে ছবি দিয়ে বড়লিয়া ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধনের কথা লেখার পর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি এটি কে নিয়েছে, কার দোকান। তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কারণ তিনি নিজেও বিএনপির কোনো সদস্য নন।”

তিনি আরও জানান, ভুক্তভোগী নারী ভোটের আগে সংসদ সদস্যের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন। সংসদ সদস্য ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নিতে থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও তিনি শুনেছেন। তবে কেন এখনো সমাধান হয়নি, তা খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দেন।

অন্যদিকে, একই দোকানের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে উদ্বোধনের কথা লেখা এডভোকেট ফোরকানুল ইসলাম বলেন, “ওই নারী থানায় অভিযোগ দিয়েছে এটা শুনেছি। তবে কার দোকান কে নিয়েছে, আমি জানি না। শুধু বিএনপির কার্যালয় দেখে ছবি তুলেছিলাম এবং ফেসবুকে দিয়েছিলাম। এর বাইরে আমি কিছুই জানি না।”

পুলিশের অবস্থান: ‘তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, “এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। ভুক্তভোগীকে থানায় ডাকা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আশা করি শিগগিরই সমাধান হবে। এখানে দুই পক্ষের কিছু লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ও উঠে এসেছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংসদ সদস্যের অবস্থান: মন্তব্য পাওয়া যায়নি

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর এক শুভাকাঙ্ক্ষী নেতা জানান, সংসদ সদস্য বর্তমানে একটি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা

ঘটনাটি এক মাস ধরে চললেও ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। জমি বা দোকান সংক্রান্ত বিরোধ হলেও জোরপূর্বক দখল ও হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশের উচিত দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত মালিকের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার

রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অবৈধভাবে কারও সম্পত্তি দখল করে, তাহলে তা সংশ্লিষ্ট দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। বিএনপির স্থানীয় নেতারা ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন এটি তাঁদের দলীয় কোনো কার্যালয় নয়। এখন দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের উচিত জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা দেওয়া।

একই সঙ্গে এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের এটাই সময় এমনটাই মনে করছেন বড়লিয়ার সাধারণ মানুষ।

ভুক্তভোগীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

৫৮ বছর বয়সী এক নারী, স্বামী গুরুতর অসুস্থ, ছেলেরা প্রবাসে। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস এই দোকানটি। এক মাস ধরে দোকান বন্ধ থাকায় তাঁর আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের উচিত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সমাধান করা।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের মতে, কোনো নারীর সম্পত্তি দলীয় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখল করা এলাকার জন্য কলঙ্কজনক। এলাকাবাসীর দাবি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

একজন অসহায় নারীর এক মাসের হাহাকার আজও থামেনি। প্রশাসনের আশ্বাস, বিএনপি নেতাদের অস্বীকৃতি এবং অভিযুক্তের ‘সাইনবোর্ড সরানোর’ প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

রাজিয়া হোসেনের মতো সাধারণ মানুষের জন্য আইনি প্রতিকার যত দ্রুত ও সহজলভ্য হবে, ততই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে এমনটাই বিশ্বাস এলাকাবাসীর।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ