৫ মার্চ ২০২৬

কেজিডিসিএলে ই-টেন্ডারের আড়ালে কারসাজি: ভুয়া সনদে নোয়া

ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি ঠিকাদারদের

নামই ই-টেন্ডার; কাজ পায় পছন্দের ঠিকাদার। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)-এ এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন ই-টেন্ডার বঞ্চিত ঠিকাদাররা। কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের স্টেশনারি ও প্রিন্টিং আইটেম ক্রয়ের ই-টেন্ডারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ঠিকাদাররা বলেন, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যোগসাজশ, প্রাক-মূল্যায়নে অনিয়ম এখন অহরহ। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা কেজিডিসিএল ঘেরাও কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান তারা।

সম্প্রতি কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ‘গ্রাফিকস মিডিয়া’ নামক এক ঠিকাদারের অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। অভিযোগে তিনি ই-টেন্ডারে চরম দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরেছেন। অবশ্য কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা ‘বাংলাধারা ডটকম’-কে জানিয়েছেন।

গত ২০ জানুয়ারি কেজিডিসিএলের এমডি বরাবর দেওয়া গ্রাফিকস মিডিয়ার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের স্টেশনারি ও প্রিন্টিং আইটেমের জন্য গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ই-টেন্ডার (আইডি নং–১১৭৯৯৯৩) সাবমিট করেন। ইজিপির মাধ্যমে মালামাল সরবরাহের জন্য ই-টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলেও প্রতিষ্ঠানের পারচেজ কর্মকর্তা তৈয়বুল তুহিন কাজটা দেওয়া সম্ভব না বলে জানান।

গ্রাফিকস মিডিয়া কর্তৃপক্ষ আরও অভিযোগ তুলে বলেন, ক্রয় শাখার কর্মকর্তা তৈয়বুল তুহিন নিয়মবহির্ভূত ও পিপিআর আইন পরিপন্থী কার্যকলাপ অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জনৈক তৌহিদুল ইসলাম কায়সারের মালিকানাধীন ‘এস এইচ কর্পোরেশন’-কে নোয়া প্রদান করেন।

এ নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “আমরা সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিই, অথচ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হই। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উক্ত ‘এস এইচ কর্পোরেশন’ ই-টেন্ডারে সাবমিট করা সনদ ভুয়া। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সাবমিট করা সনদ ভুয়া বলে শনাক্ত করার পর কাজের ১০ শতাংশ অগ্রিম নেওয়া কাজটি ‘রিয়াদ প্রিন্টিং প্রেস’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। সূত্র দাবি করে, রিয়াদ প্রিন্টিং প্রেস নামের প্রতিষ্ঠানটির মালিকও সেই ভুয়া সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এস এইচ কর্পোরেশনের মালিক তৌহিদুল ইসলাম কায়সার।

অনিয়মের কারণে এস এইচ কর্পোরেশনের নোয়া বাতিল করে একই মালিকের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে কাজ (নোয়া) দেওয়া হলো তা জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) ফারুক হোসেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে খুব একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছি। দয়া করে অফিসে এসে কথা বলেন। কাগজপত্র দেখালে পরিষ্কার হবেন।

অভিযোগকারী ঠিকাদাররা জানান, আর্থিক সুবিধা নিয়ে কর্মকর্তা তৈয়বুল তুহিন কাজটি ই-টেন্ডার সিডিউল বাদ দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে দেন। অভিযোগের সত্যতা জানতে চাইলে কর্মকর্তা তৈয়বুল তুহিন এই প্রতিবেদককে মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। সেই সঙ্গে তিনি এই প্রতিবেদকের কথা না শুনেই বলতে থাকেন, “আপনি যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন, তা সত্যি নয়। আপনার যা ইচ্ছে লিখেন। সমস্যা নেই।”

অভিযোগের বিষয়টি জানতে ‘এস এইচ কর্পোরেশন’-এর মালিক তৌহিদুল ইসলাম কায়সারের সঙ্গে কথা হলে তিনি সামনাসামনি দেখা করতে বলেন এবং বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

জানা গেছে, শুধু ই-টেন্ডার জালিয়াতি নয়, কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কারিগরি নির্দেশিকা লঙ্ঘনেরও অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে অন্য যোগ্য দরদাতাদের কারিগরি ত্রুটির অজুহাতে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কারিগরি মূল্যায়নে জালিয়াতির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।

সরকার বদলালেও প্রতিষ্ঠানটির নীতিনির্ধারণ বা কর্মকাণ্ডে তেমন কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পুরনো ধারা বজায় রেখে একই রকম প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যা নীতিগত স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলেছে।

প্রসঙ্গত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধে চালু করা হয় ম্যাট্রিক্স পদ্ধতি। ই-টেন্ডারিংয়ের (অনলাইন) মাধ্যমে এই পদ্ধতিতে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশে ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থা চালু হলেও অসাধু ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কথা হলে টিআইবি-সনাক (সচেতন নাগরিক কমিটি) সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, কর্ণফুলী গ্যাসের এসব অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের সৎ ও কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত করানো উচিত।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ