৭ মার্চ ২০২৬

তেলাপোকা-ইঁদুরে ভরা রেস্তোরাঁগুলো

চট্টগ্রাম নগরীর নামী বেকারি-রেস্তোরাঁয় ভয়ংকর চিত্র

রমজান এলেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন বেকারি ও রেস্তোরাঁর সামনে জমে ওঠে ইফতারের বাজার। ফুটপাতে সাজানো থাকে জিলাপি, সমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি থেকে শুরু করে নানা মুখরোচক ভাজাপোড়া। ক্রেতাদের ভিড় আর ব্যস্ততায় মনে হয়— এ যেন শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবারের আড্ডা। কিন্তু সেই খাবারের উৎস রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকলেই সামনে আসে ভিন্ন চিত্র। স্যাঁতসেঁতে মেঝে, নোংরা দেয়াল, তেলাপোকা-ইঁদুরের বিচরণ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই তৈরি হচ্ছে মানুষের প্রতিদিনের ইফতার।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে চট্টগ্রাম নগরীর বেশ কয়েকটি নামী বেকারি ও রেস্তোরাঁয় এমন উদ্বেগজনক চিত্রই পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার নগরের জিইসি মোড় এলাকার হারুন বেকারিতে অভিযান চালিয়ে রান্নাঘরে শত শত তেলাপোকার বিচরণ দেখতে পান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুতের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘ছোট একটি বেকারি হলেও রান্নাঘরের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে যেন তেলাপোকার ফ্যাক্টরি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ ছিল, রান্নাঘরের ভেতরেও তারা ঘোরাঘুরি করছিল।’

একের পর এক অভিযানে একই চিত্র
শুধু হারুন বেকারিই নয়, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম নগরের একাধিক বেকারি ও রেস্তোরাঁয় একই ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের প্রমাণ পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

গত ১ মার্চ নগরের মুরাদপুর এলাকায় বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারিতে অভিযান চালিয়ে রান্নাঘরের স্যাঁতসেঁতে ফ্লোর, ভাঙা ও নোংরা টাইলস এবং নষ্ট ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যদ্রব্য দেখতে পান ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকর্তারা। ফ্রিজের ভেতরে তেলাপোকা-ছারপোকার প্রাদুর্ভাব এবং খাদ্য প্রস্তুতস্থলে বিড়ালের উপস্থিতিও পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩–এর ৩৮ ধারায় দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুমা আক্তার কণা। জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম জানান, খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি এবং কর্মীদেরও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অবহেলা দেখা গেছে।

একই অভিযানে নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় একটি মিঠাই আউটলেটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খেজুর মোড়কজাত ও সংরক্ষণ, খাদ্যপণ্যে অসম্পূর্ণ লেবেলিংসহ বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার এলাকায় জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ কাচ্চি ডাইন–এ অভিযান চালিয়ে রান্নাঘরে তেলাপোকা ও ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব দেখতে পান কর্মকর্তারা। স্যাঁতসেঁতে ফ্লোর, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত এবং কাঁচামাল অস্বাস্থ্যকরভাবে সংরক্ষণের প্রমাণ মেলায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোনিয়া হক। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এ ছাড়া কালুরঘাট এলাকার বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড এবং গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকার হোম রেসিপি ফুড বেকারিতেও রান্নাঘরে তেলাপোকা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রমাণ পেয়েছেন কর্মকর্তারা।

নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোকে আগেও জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু জরিমানা দেওয়ার পর কিছুদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার
অভিযানে আরও উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন কর্মকর্তারা। অনেক প্রতিষ্ঠানে খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। বিশেষ করে জিলাপি তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে হাইড্রোজ বা সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড, যা খাদ্যপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার চকবাজার এলাকার সাতকানিয়া ভাতঘর নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জিলাপি তৈরিতে এই রাসায়নিক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।

কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং মানুষের মেধাশক্তিও দুর্বল করে দিতে পারে। মূলত পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত এই রাসায়নিকই ব্যবহার করা হচ্ছে খাদ্য তৈরিতে। একইভাবে গোপালজল ও কেওড়াজলের মতো নিষিদ্ধ উপাদানও খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু বহন করে, যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয় ও ফুড পয়জনিংসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।

কঠোর শাস্তির দাবি
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুধু জরিমানা করলেই এসব অনিয়ম বন্ধ হবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দিয়ে আবার আগের মতোই অনিয়ম চালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘আইনে যেহেতু প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে সিলগালা করার বিধান আছে, তাই গুরুতর অপরাধে কঠোর শাস্তি দিলে অন্যরাও সতর্ক হবে।’

রমজানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব বেকারি ও রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে ইফতার করেন। কিন্তু একের পর এক অভিযানে ধরা পড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, তেলাপোকা-ইঁদুরের বিচরণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— নগরের নামী এসব প্রতিষ্ঠানে মানুষ আসলে কী খাচ্ছে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ