জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বাজেটের চাপ সামাল দিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় ওসি থেকে অতিরিক্ত কমিশনার, ট্রাফিক ইউনিট থেকে গোয়েন্দা বিভাগের মোবাইল টিম— সবখানেই অকটেন ও পেট্রলের বরাদ্দে কাটছাঁট আনা হয়েছে।
একইসঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন জ্বালানি বরাদ্দের আবেদনও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অনেক সদস্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সিএমপির যানবাহন (এমটি) শাখা সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারদের মাসিক জ্বালানি বরাদ্দ ৪০০ লিটার থেকে কমিয়ে ২০০ লিটারে নামানো হয়েছে। অপারেশনাল ইউনিটের উপকমিশনারদের (ডিসি) বরাদ্দ ৩৭৫ লিটার থেকে কমিয়ে ২৬৩ লিটার করা হয়েছে। নন-অপারেশনাল ইউনিটের ডিসিদের বরাদ্দ ৩০০ লিটার থেকে কমিয়ে ২১০ লিটারে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অপারেশনাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনারদের (এডিসি) বরাদ্দ ৩০০ লিটার থেকে কমিয়ে ২১৭ লিটার এবং নন-অপারেশনাল ইউনিটের এডিসিদের বরাদ্দ ২৫০ লিটার থেকে কমিয়ে ১৭৫ লিটার করা হয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এই কাটছাঁটের আওতায় পড়েছেন। জোনাল ট্রাফিক এসিদের জন্য বরাদ্দ ৩০০ লিটার থেকে ২১০ লিটারে নেমেছে। বন্দর জোনের এসি কর্ণফুলীর বরাদ্দ ৩৫০ লিটার থেকে কমিয়ে ২৪৫ লিটার করা হয়েছে।
কর্ণফুলী থানা ছাড়া নগরের বাকি ১৫ থানার ওসিদের মাসিক বরাদ্দ ৪০০ লিটার থেকে কমিয়ে ২৮০ লিটার করা হয়েছে। কর্ণফুলী থানার ওসির বরাদ্দ ৪৬০ লিটার থেকে ৩২২ লিটারে নামানো হয়েছে।
মোবাইল টহল গাড়ির ক্ষেত্রেও কমেছে জ্বালানি সরবরাহ। ২০১৪ সালের আগে যুক্ত হওয়া মোবাইল পার্টির গাড়িগুলোর বরাদ্দ ৪৭০ লিটার থেকে কমিয়ে ৪২০ লিটার এবং পরবর্তীতে যুক্ত গাড়িগুলোর বরাদ্দ ৪৫০ লিটার থেকে কমিয়ে ৪০০ লিটার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা বিভাগের চার জোনের মোবাইল পার্টির বরাদ্দ ৪০০ লিটার থেকে কমিয়ে ৩০০ লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট, টিএসআই ও এএসআইদের বরাদ্দও ৫০ লিটার থেকে কমিয়ে ৩৫ লিটার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির এক পুলিশ পরিদর্শক বলেন, ‘অনেক পুরোনো গাড়ি বেশি জ্বালানি খরচ করে। বরাদ্দ কমে গেলে টহল ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতায় কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।’
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িতে দায়িত্ব পালনকারীদের নতুন আবেদন বন্ধ থাকায় অনেককে নিজের টাকায় অতিরিক্ত দামে তেল কিনে ডিউটি করতে হচ্ছে।
তবে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সমন্বয় করা হচ্ছে। নন-অপারেশনাল ইউনিটে বরাদ্দ কমানো হলেও অপরাধ দমন বা অপারেশনাল কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়বে না। তেলের দাম বাড়ায় বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
অপরাধ বিশ্লেষক ও সাবেক আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তা এমরান হোসেন বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের পুলিশিং অনেকাংশে মোবাইল টহলনির্ভর। জ্বালানি বরাদ্দ কমলে টহলের পরিধি ও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং বাড়ানো গেলে সীমিত সম্পদেও কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব।’
নগর নিরাপত্তা ও সুশাসন বিশ্লেষক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনের বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা যাতে দুর্বল না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ এলাকা ও রাতের টহলে বিকল্প কৌশল প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। নতুন দরে ডিজেল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।














