দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট এটি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। দেশের ৫৫তম এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেটকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে’ বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৬৩,০১০ কোটি টাকা। এর আগে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালীন দলটির অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে পেশকৃত বাজেটগুলোর আকার প্রতি বছর আনুমানিক ১৫,০০০ থেকে ১৮,০০০ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছিল।
বাজেট বাস্তবায়নে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আসবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে সোয়া লাখ কোটি টাকার (প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা) ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো খাতের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুনর্গঠন করে কার্ডভিত্তিক বিভিন্ন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সম্প্রসারণ এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর প্রস্তাব থাকতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়িয়ে ১ কোটি মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে। এ খাতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হতে পারে।
জনসাধারণকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের ওপর কর হ্রাস এবং কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর সারচার্জ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি একীভূত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুল আলোচিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
চলতি বছরের মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী অর্থবছরে এটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারের এই বাজেট বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি করে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তাই সঠিক মুদ্রানীতি ও কঠোর বাজার তদারকি ছাড়া কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ অর্জন কঠিন হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তুত করা এই বাজেট দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।














