চট্টগ্রামকে ঘিরে বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই মহানগরী ও এর আশপাশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেশি।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছরে চট্টগ্রামের জন্য মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার ২১৯ কোটিতে। সেই হিসাবে এবার বরাদ্দ বেড়েছে ৪ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা চট্টগ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির এই সুখবরের আড়ালে রয়েছে বৈষম্যের চিত্রও। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসা পেয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ, অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) পেয়েছে তুলনামূলক কম বরাদ্দ। ফলে নগরবাসীর নিত্যদিনের নাগরিক সেবা—রাস্তাঘাট সংস্কার, সড়কবাতি স্থাপন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো খাতগুলো অর্থসংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
মেগা প্রকল্পের কারণে এবারও বরাদ্দের সিংহভাগ গেছে চট্টগ্রাম বন্দরের ঝুলিতে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্পসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ পেয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অপরদিকে নগরের স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো উন্নয়নে ওয়াসার বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় ৬০৬ কোটি টাকা বেশি।
জলাবদ্ধতা নিরসন ও ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোয় সিডিএর বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকায়। গতবারের তুলনায় সংস্থাটি ৩৮৬ কোটি টাকা কম পেয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে তিনটিতেই কোনো বরাদ্দ না থাকায় চসিকের মোট বরাদ্দ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮০ কোটি টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় ৩২০ কোটি টাকা কম।
বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অংশে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশে ১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মাতারবাড়ী বন্দরের জন্য বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।
এছাড়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। মিরসরাইয়ে ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পে রাখা হয়েছে ৮০৪ কোটি টাকা, যা শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনের লক্ষ্যে সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৭৮ কোটি টাকা। ওয়াসার চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৭৬০ কোটি টাকা। কর্ণফুলী নদীর ওপর বহুল প্রতীক্ষিত কালুরঘাট সেতু নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯৭ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৫৭ কোটি টাকা।
সামগ্রিকভাবে এবারের বাজেটে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, সমুদ্রবন্দর-কেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রত্যক্ষ নাগরিক সেবা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল কত দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।













