দীর্ঘ ৪৮ বছর আগে বাবা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কক্সবাজার সদরের পিএমখালীতে জমির চাষাবাদ বাড়াতে খনন করেছিলেন ‘পাতলী খাল’। যুগের আবর্তে অযত্ম-অবহেলায় ভরাট হয়ে খালটি ছরায় পরিণত হয়েছে। ছেলে তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রথমবার যখন কক্সবাজার আসছেন বাবার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত ‘পাতলী খাল’টি আবার পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সবকিছু ঠিক থাকলে শনিবার (১৩ জুন) সকাল ১১টার দিকে তিনি এটি উদ্বোধন করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমণের সিডিউলের প্রথমকাজ পাতলী খাল খনন প্রচার পাবার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খালখননের প্রত্যক্ষদর্শীরা সেই স্মৃতি হাতড়ে নষ্টালজিক হচ্ছেন।
এলাকার সত্তোর্ধ ব্যক্তি আলী হোসেন, মোহাম্দ ইউছুপ, জাফর আলম, ওবায়দুল হকসহ অনেকে বলেন, দেশের গতি সচল রাখতে হলে চাষীদেরও বাদ দেয়া যাবে না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনায়নে প্রত্যন্তাঞ্চলের প্রতি ইঞ্চি মাটি চাষাবাদ যোগ্য করা দরকার সেটা বুঝেছিলেন মেজর জিয়া। তাই পিএমখালীর বিস্তৃর্ণ এলাকার জমি চাষাবাদ আনুকূল্য করতে সাড়ে চারদশক আগে খনন করেছিলেন পাতলীখাল। বাবার সেই ‘কৃষক বান্ধব’ রক্তের দায় শোধ করে পিতার স্মৃতি জাগরণ করতে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবেই অধিষ্ঠিত হচ্ছেন আমাদের প্রিয় তারেক জিয়া।
এদিকে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু, ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল পিএমখালীর এক পথসভায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচিত হলে এবং তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে, পাতলী খাল পুনঃখনন উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীকে পিএমখালীতে নিয়ে আসবেন। সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে আজ।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে পিএমখালীসহ পুরো জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। খালখনন উদ্বোধনের পাশাপাশি ঐ এলাকায় সংক্ষিপ্ত সভা এবং রাতে সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে কোদাল হাতে এই পাতলী খাল খনন কাজের সূচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি খালের পাড়ে একটি খেজুর গাছও রোপণ করেন, যা আজ ৪৮ বছর পরও কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। তবে, কালের পরিক্রমায় খালটি নাব্যতা ও প্রসস্থতা হারিয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ ও বৈপ্লবিক কৃষিবিপ্লব দেখতে সে সময় বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা, নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, ভুটানের রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুক এবং শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকে।
খনন করা এই খালের পানির কল্যাণে তখন প্রায় ১২ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি চাষাবাদের আওতায় আসে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব সবুজ বিপ্লব ঘটে। তবে ৫-৬ বছর সচল থাকার পর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটিতে পলি জমে ভরাট হয়ে যায় এবং কিছু অংশ অবৈধ দখলের কবলে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় কৃষকদের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছিল।
সূত্র আরো জানায়, দীর্ঘ ২৭বছর পরিত্যক্ত থাকার পর, ২০১১ সালের ৮ ডিসেম্বর সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি পুনঃখনন করেছিলেন। তখন খালটি ৫০ফুট প্রশস্ত এবং ১৫ ফুট গভীর করায় পুনরায় পানির প্রবাহ শুরু হয়। এর ফলে খালের দুই পাড়ের ৩০ থেকে ৪০ হাজার কৃষক পুনরুজ্জীবিত হন এবং প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমিতে পুরোদমে চাষাবাদ শুরু হয়। একদশকে আবারও ভরাটের কবলে পড়েছে খালটি। বর্তমান সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত মাসের ৯ মে এমপি কাজল খালটি পুনঃখনন কাজের প্রাথমিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খালের উভয় পাশে স্কেভেটর ও শ্রমিকেরা কাজ করলেও প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মাধ্যমে আজ তা বৃহৎ আকারে কাজের প্রসার ঘটবে।
তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় অনেকে বলেন, খালটি বাংলাবাজার অংশের মুখ এবং বেশকিছু অংশ অবৈধ দখলে চলে গেছে। আবর্জনার ভাগাড় বানিয়ে কৌশলে দখল জারি রেখেছে দখলবাজচক্র। অনেকে খালপাড়ে পাকা দালান তোলেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ পাতলী খাল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে রোপণ করা সেই ঐতিহাসিক খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন এবং খালের বর্তমান চিত্র পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় এমপি লুৎফুর রহমান কাজল প্রতিমন্ত্রীর কাছে এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং কৃষিক্ষেত্রে খালের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
স্থানীয় অধিবাসী এম বেদারুল আলম ও শাহী কামরান উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, আমাদের জন্মের আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পিএমখালীতে এসে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে খাল খনন করেছিলেন। সেই ইতিহাস দাদা-বাবাদের গল্পে শুনেছি দেখিনি। কিন্তু আজ (১৩জুন) তাঁরই সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসছেন মৃতপ্রায় পাতলী খালকে স্বমহিমায় ফেরাতে। বাবাকে না দেখলেও তারুণ্যের অহংকার ছেলে প্রধানমন্ত্রীকে দেখবো আমাদের আনন্দের সীমা নেই। এমপি কাজল সাহেব নির্বাচনের পথসভায় যে কথা দিয়েছিলেন, তা রেখেছেন। পিএমখালীবাসী আজীবন এমপি কাজল ও বিএনপির কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
তবে, শুধু খোলা অংশ খনন নয়, জবরদখলে চলে যাওয়া অংশগুলোও উদ্ধার করে খননের আওতায় এনে পূর্ণতা আশা করছে সবাই।
ঈদগাঁও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিম মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের একটি বৃহৎ জাতীয় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বর্ষার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো। কক্সবাজারে পাতলি খাল দিয়ে সেই যাত্রার সুচনা হলো।
শনিবারের সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ১০টায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এরপর সদরের পিএমখালীর পাতলী খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন এবং সেখানে আয়োজিত পথসভায় অংশ নেবেন। পরে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন এবং মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
সেটা শেষ করে যাবেন পেকুয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কক্সবাজারের প্রথম শহিদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
সফরে নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভা ও মাতামুহুরি উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি বিকালে চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালে আয়োজিত রাজনৈতিক জনসভায় প্রধান অতিথি হয়ে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণ শেষে তিনি মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও সমুদ্রসৈকত পরিদর্শন করে রাতে কক্সবাজার শহরের লং বিচ হোটেলের অডিটোরিয়ামে সুধী সমাবেশে যোগ দেয়ার পর কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। ১২ঘন্টার সিডিউল কর্মসূচী শেষে একই দিন রাত ১১টার দিকে তার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।













