২৪ অক্টোবর ২০২৬

‘চা-খরচ’ থেকে মাসিক মাসোহারা লাখ লাখ— মইজ্জ্যারটেকে টিআই সাঈদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

চট্টগ্রাম শহরের প্রবেশদ্বার মইজ্জ্যারটেক। ঢাকা- চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশ দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে হাজার হাজার যানবাহন। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক ঘিরেই অবৈধ যানবাহন চলাচল, কথিত টোকেন বাণিজ্য এবং নিয়মিত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) আবু সাঈদ বাকের বলেছেন, ‘গত মাসে টোকেন বাণিজ্য ছিল। এ মাস থেকে কোনো টোকেন নেই। সব অনিয়ম বন্ধ।’

অথচ ‘ক্যাশিয়ার’ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
প্রতিবেদকের হাতে আসা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, সাদা টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি বিভিন্ন বাস কোম্পানির চালক, হেলপার ও মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক অর্থ সংগ্রহ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সংগৃহীত অর্থের হিসাব রাখার জন্য ওই ব্যক্তিকে টিআই আবু সাঈদ বাকেরের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে—আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তার অধীনে কোনো বেসরকারি ব্যক্তি নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন কি না।

যদি পারেন, তাহলে এর বৈধতা কী? আর যদি না পারেন, তাহলে দিনের পর দিন এমন কার্যক্রম চললেও তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসছে না কেন?

শত শত বাস থেকেও মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ

নতুনব্রিজ থেকে পটিয়া এবং নতুনব্রিজ থেকে শান্তিরহাট রুটে চলাচল করে শত শত বাস। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এ রুটে প্রায় ১২০টি ছোট মিনি বাস এবং ১৩০টি বড় বাসসহ ৩০০টিরও বেশি বাস চলাচল করে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব যানবাহন থেকেও নিয়মিত মাসিক অর্থ আদায় করা হয়। স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, ‘এনাম কোম্পানি’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি এই অর্থ সংগ্রহ করেন। পরে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই বণ্টন ব্যবস্থায় টিআই আবু সাঈদ বাকেরের ভাগে মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা যায়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। ৪ হাজার গ্রামীণ সিএনজি, টোকেন ছাড়া ‘নামতে সাহস পায় না’? সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মহাসড়কে চলাচলকারী গ্রামীণ সিএনজি নিয়ে।

স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, আনোয়ারা, বাঁশখালী, পেকুয়া, মগনামা ও বদরখালীসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার গ্রামীণ সিএনজি মহাসড়কে চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, টোকেন ছাড়া এসব যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করতে পারে না। আবার টোকেন থাকলে চেকপোস্টে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কোনো জটিলতায় পড়তে হয় না।

অর্থাৎ অভিযোগ সত্য হলে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে আইন এড়িয়ে যাওয়ার একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চালকরা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের খরচ তুলতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করেন। ফলে কথিত মাসিক অর্থ আদায়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে।

পুলিশ বদলি হয়, ‘সিন্ডিকেটের লোক’ থেকে যায়?
অনুসন্ধানে সাকিব নামের এক ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কথিত টোকেন বাণিজ্যের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বদলি হলেও ওই ব্যক্তির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় না। এ ছাড়া ইউসুফ, ইউনুস, রাকিব ও আনোয়ারসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

কোনো কোনো পরিবহন থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা, আবার কোনো কোনো পরিবহন থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ‘চা-খরচ’ নামে ঈগল পরিবহন থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।প্রতিবেদকের দাবি, এসব আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত রয়েছে।

চোরাই সিএনজি চলাচলের অভিযোগ
টোকেন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে চোরাই সিএনজিও মহাসড়কে চলাচল করে— এমন অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগটি সত্য হলে, বিষয়টি শুধু অবৈধ যান চলাচল বা অর্থ আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সরাসরি জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত।

কারণ কোনো চোরাই যানবাহন যদি অর্থের বিনিময়ে চেকপোস্ট পার হয়ে যায়, তাহলে সেটি কোথায় যাচ্ছে, কার হাতে যাচ্ছে কিংবা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে— এসব প্রশ্নও সামনে আসে।

অভিযান শেষ হলেই ফিরে আসে অটোরিকশা
মইজ্জ্যারটেক স্টেশন এলাকাতেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। কয়েকদিন পর পুরো এলাকা পুনরায় অবৈধ যানবাহনে ভরে যায়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করেই এসব যানবাহন আবার রাস্তায় নামে।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে— অভিযান যদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে, তাহলে এসব অভিযান কি কেবল লোক দেখানো? নাকি অভিযানের আড়ালে চলছে সাময়িক ‘ম্যানেজমেন্ট’?

পুলিশের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক (বন্দর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) কবীর আহমেদ বলেন, ‘আপনারা পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব তথ্য-উপাত্ত পেয়েছেন, সেগুলো আমাদের দিন। কোনো বেসামরিক ব্যক্তির ট্রাফিক পুলিশ বক্সের দাপ্তরিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ নেই। আপনারা যে অভিযোগ ও তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) আবু সাঈদ বাকের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত মাসে টোকেন বাণিজ্য ছিল। এ মাস থেকে কোনো টোকেন নেই। সব অনিয়ম বন্ধ। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে আমরা ব্যানার টাঙিয়েছি। কোনো অনিয়ম চলবে না।’ তবে সড়কের মোড়ে মোড়ে কথিত দালালচক্রের মাধ্যমে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেট, অবৈধ অর্থ লেনদেন, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত জরুরি।

কারণ অভিযোগগুলো সত্য হলে, এটি কোনো ছোটখাটো অনিয়ম নয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল, টোকেন বাণিজ্য ও নিয়মিত অর্থ আদায়ের চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন— দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করে কি না। মহাসড়ক কি আইনের অধীনে চলবে, নাকি টাকার বিনিময়ে?—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্ট ও সাধারণ মানুষ। জনস্বার্থে প্রশ্ন থাকল— মইজ্জ্যারটেকের কথিত টোকেন বাণিজ্যের তদন্ত হবে কবে?

অনুসন্ধান চলমান…..

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ