৩০ অক্টোবর ২০২৬

ভুয়া সমিতির টোকেনই ‘মহাসড়কের পাস’

মইজ্জ্যারটেকে ‘টোকেনের রাজত্ব’, সাত বছরেও থামেনি চাঁদা বাণিজ্য

সাত বছর আগে— ২০১৯ সালে— কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক ও আশপাশের মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছিল, তার কেন্দ্রে ছিল ‘টোকেন’। তখন অভিযোগ ছিল— ট্রাফিক পুলিশ, কথিত মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের নামে মাসে মাসে টাকা দিয়ে মহাসড়কে চলাচলের ‘অনুমতি’ নিচ্ছে অবৈধ সিএনজি ও তিন চাকার যানবাহন। সাত বছর পর, ২০২৬ সালে এসে প্রশ্ন উঠছে— টোকেন কি বন্ধ হয়েছে?

নাকি শুধু বদলেছে টোকেনের মালিকানা, আদায়ের পদ্ধতি আর চাঁদার অঙ্ক? দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেক। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে হাজার হাজার যানবাহন। আইন অনুযায়ী, গ্রামীণ সিএনজির জাতীয় মহাসড়কে চলাচল নিয়ে রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে সেই বিধিনিষেধকে পাশ কাটিয়ে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ সিএনজি মহাসড়কে চলাচল করছে। আর এসব যানবাহনের অনেকগুলোর জন্য যেন তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য ‘পাস’ ব্যবস্থা।

কাগজে যার কোনো সরকারি বৈধতা নেই, কিন্তু মাঠে সেটিই হয়ে উঠেছে মহাসড়কে চলাচলের নিরাপত্তা-চিহ্ন— এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

২০১৯ সালে টোকেন ছিল সমিতির হাতে
২০১৯ সালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল, কর্ণফুলীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী সিএনজি ও তিন চাকার যানবাহনের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে। কোথাও ‘লাইনম্যান’, কোথাও ‘দুর্ঘটনা ফান্ড’, কোথাও ‘মৃত্যু ফান্ড’, আবার কোথাও ‘কল্যাণ ফান্ড’— বিভিন্ন খাতে টাকা আদায়ের রশিদও ছিল। তখন চালকদের অভিযোগ ছিল, মাসিক টোকেন ছাড়া মহাসড়কে চলাচল করা কঠিন।

কেউ কেউ জানিয়েছিলেন, টোকেন থাকলে গাড়ির কাগজপত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সেই টোকেনই। ২০১৯ সালের সেই প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছিল— বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন, মালিক সমিতি ও স্থানীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রতিদিন, মাসে এবং বছরে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ। তখন প্রশ্ন উঠেছিল— এই টাকা যাচ্ছে কার পকেটে? অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ হচ্ছে না কেন? টোকেন বাণিজ্য রুখবে কে? সাত বছর পরও সেই প্রশ্নের অনেকগুলোর উত্তর মেলেনি।

২০২৬ সালে অভিযোগ আরও বড় পরিসরে
বর্তমানে অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দক্ষিণ চট্টগ্রামের একাধিক উপজেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রামীণ সিএনজি মহাসড়কে ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে ৭০০, ৮০০, ১ হাজার থেকে শুরু করে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত ‘টোকেন’ বা অনুরূপ ব্যবস্থার নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সাত বছর আগে যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই ব্যবস্থাই আরও সংগঠিত ও বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে কি না— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

কারণ, ২০১৯ সালে যেখানে বিভিন্ন সমিতি ও স্থানীয় সংগঠনের নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল, বর্তমানে অভিযোগ উঠছে— মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য তৈরি হয়েছে আরও কেন্দ্রীভূত একটি ‘টোকেন সিন্ডিকেট’।

বদলেছে সরকার, বদলেছে সময়— বদলায়নি কি ‘টোকেনের রাজত্ব’?
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরোনো প্রভাববলয় ভেঙে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেকের সড়কে প্রশ্ন উঠছে—রাজনৈতিক পালাবদল কি টোকেন বাণিজ্য বন্ধ করতে পেরেছে?

নাকি পুরোনো ব্যবস্থার জায়গায় এসেছে নতুন নিয়ন্ত্রক? ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে যেসব সমিতি, শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল, তাদের অনেকেই এখন আগের মতো প্রকাশ্যে নেই। কিন্তু মাঠের অভিযোগ বলছে, সিএনজি চলাচল বন্ধ হয়নি। টোকেন বন্ধ হয়নি। অর্থ আদায় বন্ধ হয়নি। শুধু বদলেছে ব্যবস্থাপনার ধরন।

টোকেন ছাড়া গাড়ি আটক, টোকেন থাকলে ছাড়— এমন অভিযোগ
স্থানীয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মহাসড়কে চলাচলকারী অনেক সিএনজির ক্ষেত্রে ছোট কাগজ, স্টিকার বা বিশেষ চিহ্নই হয়ে উঠেছে পরিচয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব চিহ্ন থাকলে গাড়ি অনেক সময় চেকপোস্ট পার হয়ে যায়। আর চিহ্ন না থাকলে শুরু হয় অভিযান। এমনকি কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যের অভিযোগ, মহাসড়ক থেকে আটক করা কিছু অবৈধ সিএনজি ট্রাফিক বক্সে নেওয়ার পর বিভিন্ন ফোনকলের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো হয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— আইন কি গাড়ির কাগজ দেখে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি টোকেন দেখে?

মাঠে অভিযান, পরে আবার আগের চিত্র
মইজ্জ্যারটেক এলাকায় মাঝেমধ্যে অবৈধ সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। কিছু যানবাহন আটক করা হয়। কিছু মামলা হয়। কিছুদিনের জন্য সড়কে শৃঙ্খলা ফেরে। তারপর আবার আগের চিত্র। মহাসড়কের পাশে, স্টেশন এলাকায়, বিভিন্ন সংযোগ সড়কে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়ে অবৈধ যানবাহন।

স্থানীয়দের প্রশ্ন— যদি এগুলো অবৈধ হয়, তাহলে বারবার ফিরে আসে কীভাবে? আর যদি বৈধ হয়, তাহলে তাদের বৈধতার সরকারি কাগজ কোথায়?

প্রতিদিনের চাঁদার বোঝা শেষ পর্যন্ত যাত্রীর পকেটে
একজন সিএনজি চালক যদি প্রতিমাসে টোকেন, লাইনম্যান, বিভিন্ন ফান্ড কিংবা অন্যান্য নামে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেন, সেই টাকা শেষ পর্যন্ত কোথা থেকে আসবে? অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য— যাত্রীর কাছ থেকেই। ফলে টোকেন বাণিজ্যের অর্থনৈতিক বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের ওপর। একদিকে অবৈধ যানবাহন মহাসড়কে বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অন্যদিকে কথিত টোকেনের নামে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। অর্থাৎ— আইন ভাঙছে এক পক্ষ, টাকা দিচ্ছে আরেক পক্ষ, আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

২০১৯ সালের প্রশ্নের উত্তর কি ২০২৬ সালেও অমীমাংসিত?
২০১৯ সালে প্রশ্ন ছিল—টোকেন বাণিজ্যের টাকা যাচ্ছে কার পকেটে?২০২৬ সালে প্রশ্নটি আরও বড় হয়েছে— সাত বছর পরও কেন মহাসড়কে অবৈধ টোকেন ব্যবস্থা টিকে আছে? কারা এই ব্যবস্থার নেপথ্যে? কোনো ব্যক্তি? কোনো সমিতি? কোনো রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া? নাকি দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার নীরব প্রশ্রয়?

বর্তমান অভিযোগের কেন্দ্রে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক বক্সের টিআই আবু সাঈয়েদ বাকারসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। কারণ, কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না। কিন্তু অভিযোগ যদি হয়— জাতীয় মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল, টোকেনের নামে অর্থ আদায়, আটক করা গাড়ি ছেড়ে দেওয়া এবং দায়িত্বের অপব্যবহার—তাহলে বিষয়টি শুধু স্থানীয় অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়।

এখন প্রয়োজন তদন্ত—নতুন টোকেন সিন্ডিকেট নাকি পুরোনোরই নতুন সংস্করণ? ২০১৯ সালের প্রতিবেদন থেকে ২০২৬ সালের অভিযোগ পর্যন্ত একটি বিষয় পরিষ্কার— সাত বছর ধরে অভিযোগের ভাষা বদলেছে, চাঁদার অঙ্ক বদলেছে, ব্যবস্থাপনার ধরন বদলেছে; কিন্তু ‘টোকেন’ নামের সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি— এমন অভিযোগই জোরালো।

তাই এখন প্রশ্ন—মইজ্জ্যারটেকের মহাসড়কে চলাচলকারী প্রতিটি সিএনজির বৈধতা কি যাচাই করা হবে? টোকেনের নামে আদায় করা অর্থের হিসাব কি তদন্ত হবে?

কারা অর্থ সংগ্রহ করছে, কারা নির্দেশ দিচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছে—তা কি অনুসন্ধান করা হবে? ২০১৯ সালে যদি টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সাত বছর পরও একই অভিযোগ কেন? আর ২০২৬ সালের অভিযোগ যদি সত্য না হয়, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হবে না কেন?

নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ (টিআই) আবু সাঈদ বাকের বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। বরং একটি সিন্ডিকেট আমাকে ম্যানেজ করার জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। ওই সিন্ডিকেট মইজ্জ্যারটেকে সিএনজি অটোরিকশায় টোকেন দিয়ে বাণিজ্য করতে চেয়েছিল। তবে আমাদের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে ওই সিন্ডিকেটই আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও মিথ্যা সংবাদ করাচ্ছে বলে আমি মনে করি। এসব অভিযোগের কোনোটিই সত্য নয়। ঘটনার ভেতরে গেলে আরও অনেক কিছু জানা যাবে। এমনকি একটি তদন্তেও তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে যে, আমাকে ম্যানেজ করতে পারেনি।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক (বন্দর) বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেকসহ নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশে, টুলবক্সে ও ওভারব্রিজে ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে নির্দেশনা প্রচার করেছে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো ও যানজট নিরসনে পাঁচটি নির্দেশনা জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশের নাম ব্যবহার করে কোনো সিএনজিচালিত অটোরিকশায় টোকেন বিক্রি করা যাবে না। টোকেন বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সিএমপির ট্রাফিক-বন্দর বিভাগ জানিয়েছে, এসব নির্দেশনা অমান্য বা নিয়ম ভঙ্গ করলে গাড়ি আটকসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যদিও গত বছরের ২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে অভিযান চলাকালে ট্রাফিক পুলিশের ওপর সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় চালকদের সাথে ট্রাফিক পুলিশের হাতাহাতি হয়। এতে সার্জেন্ট ইমতিয়াজ শাহরিয়ার ও কনস্টেবল সালাউদ্দিন আহত হন। মামলাও হয় কর্ণফুলী থানায়। কিন্তু অগ্রগতি চোখে পড়ার মত নয়।

আরও পড়ুন