৫ নভেম্বর ২০২৬

বান্দরবানের ‘ডিজিটাল পাড়া’, যেখানে অচেনারাও আপন

বান্দরবানের পাহাড়ি পথে ঘুরতে গিয়ে হাতঘড়ি হারিয়ে ফেলেছিলেন নোয়াখালীর পর্যটক মো. সারোয়ার সাইফুল। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হারানো একটি ঘড়ি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি ছিল না। তবু তিনি চেষ্টা করেছিলেন। নিজের হারানো ঘড়িটির কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দেন ফেসবুকের ‘বান্দরবানবাসী’ গ্রুপে।

এরপর যা ঘটল, তা অনেকটা গল্পের মতো….

গ্রুপের একজন সদস্য ঘড়িটি খুঁজে পান। সারোয়ারকে চিনতেন না তিনি, পরিচয়ও ছিল না আগে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই ভার্চুয়াল যোগাযোগই শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে দেয় হারানো ঘড়ি। পরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সারোয়ার লিখেছিলেন, নোয়াখালীর পক্ষ থেকে তিনি এই গ্রুপের সদস্য ও অ্যাডমিনদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

এই একটি ঘটনা ‘বান্দরবানবাসী’ নামের ফেসবুক গ্রুপটির চরিত্র বুঝতে যথেষ্ট। এখানে কেউ কাউকে হয়তো ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। তবু প্রয়োজনে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ান। কখনো রক্তের প্রয়োজনে, কখনো হারানো জিনিস উদ্ধারে, কখনো কোনো তথ্যের সন্ধানে। পাহাড়ি শহর বান্দরবানে তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই গ্রুপটি অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল পাড়া’। এই পাড়ায় এখন সদস্য দেড় লাখের বেশি।

প্রয়োজনের সময় একটি পোস্টই যথেষ্ট
কেউ রক্ত খুঁজছেন— পোস্ট হচ্ছে গ্রুপে। কেউ একটি মোবাইল ফোন পেয়েছেন— মালিককে খুঁজতে খবর যাচ্ছে সেখানে। কোনো দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য শিক্ষক দরকার— সেটিও জানানো হচ্ছে একই প্ল্যাটফর্মে।

প্রিন্স নিদোলের অভিজ্ঞতাও তেমনই। রক্তের প্রয়োজনে যোগাযোগ করে তিনি ও-পজিটিভ রক্তের সন্ধান পেয়েছিলেন। পরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গ্রুপে নিজের অনুভূতির কথা জানান।

নিউ জাই খেয়াংয়ের গল্পটিও আলাদা নয়। খেয়াং ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক খুঁজতে তিনি গ্রুপে একটি পোস্ট করেছিলেন। তাতে এত মানুষের সাড়া আসে যে প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।

আবার সিএনজি চালক মো. এমরানের গাড়িতে একটি ভিভো ফোন পাওয়ার পর সেটির মালিককে খুঁজে বের করার উদ্যোগও নেওয়া হয় এই গ্রুপের মাধ্যমে। এভাবে একটি পোস্ট কখনো হয়ে ওঠে রক্তদাতার সন্ধান, কখনো হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার পথ, আবার কখনো কারও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যার সমাধান।

কোরবানির সময়ও গ্রুপটির ব্যবহার দেখা যায় ভিন্নভাবে। স্থানীয় খামারিরা নিজেদের পশুর তথ্য প্রকাশ করেন সেখানে। ক্রেতারাও সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন বিক্রেতার সঙ্গে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমে, সহজ হয় সরাসরি লেনদেন।

পাহাড়ের শহরে তথ্যের আরেক কেন্দ্র
‘বান্দরবানবাসী’র কার্যক্রম শুধু ব্যক্তিগত সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় নাগরিক সমস্যা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে এই প্ল্যাটফর্ম।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রুপটির যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কোনো নাগরিক সমস্যা নিয়ে পোস্ট করার পর অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হয় দ্রুত। বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কোনো সমস্যার কথা জানালে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাও কখনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান।

এতে গ্রুপটি অনেকটা এমন একটি উন্মুক্ত জায়গায় পরিণত হয়েছে, যেখানে নাগরিক ও প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে খুব অল্প সময়ে। দুর্যোগের সময় এই ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বন্যার সময় বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি, সড়কের অবস্থা কিংবা কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গ্রুপে। কোথাও পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ, কোথাও গাছ পড়ে বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত— স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেই আসে এসব তথ্য।

ফলে একদিকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিজেদের এলাকার খবর জানতে পারেন, অন্যদিকে প্রশাসনের কাছেও পৌঁছে যায় মাঠপর্যায়ের তথ্য। নাগরিক সাংবাদিকতার এই চর্চাই ‘বান্দরবানবাসী’কে অন্য অনেক ফেসবুক গ্রুপের তুলনায় আলাদা করে তুলেছে।

শুরুটা ছিল ছোট
এই বড় নেটওয়ার্কের শুরুটা অবশ্য এত বড় ছিল না। সাংবাদিক ফরিদুল আলম সুমন ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই ‘বান্দরবান পৌরবাসী’ নামে গ্রুপটির যাত্রা শুরু করেন। তখন মূল লক্ষ্য ছিল পৌর এলাকার নাগরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং সাধারণ মানুষকে নাগরিক সাংবাদিকতায় যুক্ত করা।

ক্রমে গ্রুপে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। পৌর এলাকার গণ্ডি পেরিয়ে আলোচনায় আসতে থাকে পুরো জেলার নানা বিষয়। তখনই বদলে যায় নাম—‘বান্দরবান পৌরবাসী’ থেকে ‘বান্দরবানবাসী’।

বর্তমানে গ্রুপটির কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত আছেন স্বেচ্ছাসেবী মডারেটরদের একটি দল। প্রতিষ্ঠাতা ফরিদুল আলম সুমনের ভাবনাটি ছিল সহজ—মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানো এবং একে অন্যের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য জায়গা তৈরি করা। সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বড় একটি সামাজিক নেটওয়ার্কে।

ফেসবুকের বাইরেও ছড়িয়েছে কার্যক্রম
সময়ের সঙ্গে ‘বান্দরবানবাসী’ শুধু সমস্যা সমাধানের জায়গা হয়ে থাকেনি। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সামনে আনা, বিনোদনমূলক আয়োজন এবং ডিজিটাল সচেতনতা তৈরির কাজেও যুক্ত হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।

২০২২ সালে আয়োজন করা হয় অনলাইন উদ্যোক্তা মেলা। এতে জেলার ২৫ জন উদ্যোক্তা অংশ নেন। একই বছর বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছিল একটি প্রেডিকশন গেম। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও এতে যুক্ত হয়।

সাইবার নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীলভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতেও উদ্যোগ নিয়েছে গ্রুপটি। ২০২৫ সালে আয়োজন করা হয় ‘স্মার্ট নেটিজেন’ কুইজ। এতে অংশ নেন কয়েকশ প্রতিযোগী। অর্থাৎ, একটি ফেসবুক গ্রুপ ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ, তথ্য, বিনোদন, ব্যবসা ও সামাজিক উদ্যোগের মিলনস্থল।

এবার রক্তদাতার তথ্যও হাতের মুঠোয়
মানুষের জরুরি প্রয়োজনে আরও দ্রুত সাড়া দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ‘বান্দরবানবাসী’। চালু করা হয়েছে ‘বান্দরবানবাসী ব্লাড ডোনার ডাটাবেইজ’ নামে একটি ওয়েব অ্যাপ। এখানে জরুরি মুহূর্তে রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী দাতার তথ্য খুঁজে যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে। রক্ত দিতে আগ্রহীরাও সহজেই নিজেদের তথ্য নিবন্ধন করতে পারেন।

এই সেবাকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কিউআর কোড স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপটির কার্যক্রম ও বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে চালু হয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট।

বান্দরবানের পাহাড়ি ভূগোল মানুষকে অনেক সময় একে অপরের কাছ থেকে দূরে রাখে। কিন্তু সেই দূরত্ব যেন অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে একটি ফেসবুক গ্রুপ। এখানে কেউ হারানো ঘড়ি খুঁজে পান, কেউ পান জরুরি রক্ত। কেউ হারানো ফোনের মালিকের সন্ধান পান, আবার কেউ খুঁজে পান নিজের প্রয়োজনের মানুষটিকে।

ভার্চুয়াল জগতে তৈরি এই পাড়ার বাসিন্দারা পরস্পরের কাছে অচেনা হতে পারেন। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে সেই অচেনা মানুষই যখন পাশে দাঁড়ান, তখন ফেসবুকের একটি গ্রুপ আর শুধু গ্রুপ থাকে না— তা হয়ে ওঠে মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর এক নতুন ঠিকানা।

আরও পড়ুন